একদিকে ভারতের কৃষি ও গ্রামীণ অর্থনীতি রক্ষার জোরালো তাগিদে পাঞ্জাব-হরিয়ানা সীমান্তে অবরুদ্ধ কৃষকদের ঐতিহাসিক ‘দিল্লি চলো’ হাঁক, অপরদিকে প্রশাসনিক নীতি ও দুর্নীতির প্রতিবাদে তরুণ ও নাগরিক সমাজের অভিনব ‘ককরোচ জনতা পার্টির’ (সিজেপি) তীব্র আন্দোলন এই দুইয়ের যুগপৎ ধাক্কায় ভারতের রাজধানী দিল্লি এখন এক চরম দ্বিমুখী রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে পড়েছে। প্রস্তাবিত ভারত-মার্কিন বহুমাত্রিক দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির বিরুদ্ধে দিল্লিতে আয়োজিত ‘কিষাণ মহাপঞ্চায়েতে’ যোগ দিতে যাওয়া পাঞ্জাবের শত শত কৃষককে শম্ভু সীমান্তে আটকে দিয়েছে হরিয়ানা পুলিশ। দিল্লি প্রবেশের পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কৃষকরা শম্ভু সীমান্তকেই অনির্দিষ্টকালের জন্য তাদের প্রতিবাদস্থল বানিয়ে অবস্থান নিয়েছেন। কৃষক নেতাদের অভিযোগ, হরিয়ানা পুলিশ অন্যায়ভাবে পাঞ্জাবের সীমানার ভেতরে ঢুকে ব্যারিকেড তৈরি করেছে, আর পাঞ্জাব সরকার কোনো বাধা না দিয়ে দর্শকের ভূমিকা পালন করছে। তবে কুরুক্ষেত্র ও আম্বালার কৃষকরা ভিন্ন পথে দিল্লির উদ্দেশ্যে যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত ভারত-মার্কিন যৌথ বিবৃতিতে ২০২৬ সালের শরতের মধ্যেই প্রথম ধাপের বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার ঘোষণা আসার পরই মূলত এই আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। ‘দেশ বাঁচাও মোর্চা’র ব্যানারে পাঞ্জাব, হরিয়ানা ও হিমাচল প্রদেশের কৃষক সংগঠনগুলো জোরালো দাবি তুলেছে যে, এই চুক্তির ফলে আমেরিকার সয়াবিন, ভুট্টা, তুলা, আপেল, বাদাম ও দুগ্ধজাত সস্তা পণ্য ভারতীয় বাজারে অবাধে প্রবেশ করবে। মার্কিন সরকারের বিপুল ভর্তুকির কারণে আসা এসব পণ্যের সঙ্গে দেশীয় বাজারে টিকতে না পেরে লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক সর্বস্বান্ত হয়ে পড়বেন। বিশেষ করে ভারতের দুগ্ধ খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত প্রায় আট কোটি গ্রামীণ পরিবার চরম ঝুঁকির মুখে রয়েছে। চুক্তি সংক্রান্ত সমস্ত নথিপত্র জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং কৃষক ও দুগ্ধ উৎপাদকদের সঙ্গে আলোচনা ছাড়া কোনো চুক্তি না করার স্পষ্ট আল্টিমেটাম দিয়েছে কৃষক মোর্চা।
কৃষকদের এই আন্দোলনের পাশাপাশি দিল্লির রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তপ্ত করে তুলেছে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র (সিজেপি) ব্যানারে চলা তরুণ ও শিক্ষার্থীদের তীব্র আন্দোলন। তাদের প্রধান ক্ষোভের কারণ ছিল মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা নিট (এনইইটি)-এর প্রশ্নপত্র ফাঁস, যার ফলে লাখ লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে পড়েছে এবং বহু শিক্ষার্থী হতাশায় আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, প্রশ্নফাঁসে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ এবং অনশনে যাওয়া লাদাখের শিক্ষা অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুকের অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে গত সোমবার মধ্য দিল্লিতে হাজারো মানুষ জড়ো হন। পুলিশের বাধা, লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস উপেক্ষা করে আন্দোলনকারীরা সংসদ অভিমুখে যাত্রার চেষ্টা চালান। সরকারের সঙ্গে সিজেপির প্রতিনিধিদের সংক্ষিপ্ত বৈঠক কোনো আশানুরূপ ফল না দেওয়ায় আন্দোলনকারীরা রাজপথ ছাড়তে নারাজ। সবমিলিয়ে কৃষকদের সীমান্ত অবরোধ এবং তরুণ সমাজের এই তীব্র অসন্তোষের মুখে নরেন্দ্র মোদি সরকারের প্রশাসন বর্তমানে এক জটিল ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন