গ্যাসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমিয়ে ফার্নেস অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা হাতে নিলেও তীব্র আর্থিক সংকটের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড বা পিডিবি। পর্যাপ্ত অর্থের অভাব এবং জ্বালানি তেলের মজুত তলানিতে ঠেকে যাওয়ায় সরকারি ও বেসরকারি তেলভিত্তিক অধিকাংশ বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। এর ফলে দেশের শিল্পকারখানাগুলোতে এখনো চরম গ্যাস সংকট অব্যাহত রয়েছে। এই সংকট নিরসনে আগামী এক মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার টনের বেশি ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে চায় পিডিবি, যার জন্য জরুরি ভিত্তিতে সরকারের কাছে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ বিভাগ ইতিমধ্যে এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করেছে।
সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে গ্যাসের ব্যবহার কমিয়ে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে পিক আওয়ারে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। এই লক্ষ্য বাস্তবায়িত হলে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের ব্যবহার প্রায় ২০ কোটি ঘনফুট হ্রাস পাবে এবং সাশ্রয় হওয়া সেই গ্যাস শিল্প খাতে সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, বর্তমান সংকটের কারণে শিল্পে ন্যূনতম গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। যদিও সংকটকালীন সময়ে বিদ্যুৎ খাতে দৈনিক গ্যাসের বরাদ্দ ৯৫ কোটি ঘনফুট থেকে কমিয়ে ৮৫ কোটি ঘনফুট করা হয়েছিল, বাস্তবে বিদ্যুৎ খাতে এখনো প্রায় ৮৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, গৃহস্থালি ও সিএনজি পাম্পগুলোতে গ্যাসের চাপ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়েনি।
এদিকে পিডিবি জানিয়েছে, চাইলেই রাতারাতি তেলভিত্তিক কেন্দ্রে উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব নয়, কারণ বর্তমানে প্রায় ৩০টি তেলভিত্তিক কেন্দ্রের তেলের মজুত একদম শেষের পথে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন বা বিপিসির কাছে জরুরি ভিত্তিতে ৮৫ হাজার ৮৫০ টন ফার্নেস অয়েল সরবরাহের চাহিদা পাঠানো হলেও বিপিসির পক্ষে এই মুহূর্তে তা দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে। কারণ চলতি বছরে পিডিবির জন্য ৭৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েলের চাহিদা থাকলেও ইতোমধ্যে ১ লাখ ২০ হাজার টন কেনা হয়েছে এবং বর্তমানে বিপিসির ট্যাংকে মাত্র ৩৩ হাজার টন তেল মজুত রয়েছে। তবে বিদ্যুৎ খাতের জন্য চলতি বছরে আরও ২৫ হাজার টন ফার্নেস অয়েল আমদানির প্রক্রিয়া চলছে।
অন্যদিকে পিডিবি বিদ্যুৎ সচিবের কাছে পাঠানো চিঠিতে স্পষ্ট করেছে যে, সরকারের ৪ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের টার্গেট পূরণ করতে হলে এক মাসে ৬ লাখ ৩০ হাজার ৫০০ টন ফার্নেস অয়েল প্রয়োজন হবে। প্রতি লিটার ১০০ টাকা হিসাব ধরলে এই তেল কিনতে পিডিবির প্রয়োজন হবে ৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা, যা অগ্রিম না পেলে তেল সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। অথচ পিডিবি নিজেই প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকার বকেয়া দেনায় জর্জরিত। এছাড়া বেসরকারি পাওয়ার প্রডিউসার অ্যাসোসিয়েশন বা বিপ্পার সভাপতি ডেভিড হাসনাত জানিয়েছেন, বেসরকারি ৫৩টি ফার্নেস অয়েলভিত্তিক কেন্দ্র দৈনিক ৫ হাজার মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম হলেও সরকারের কাছে তাদের ৭ থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা বকেয়া বিল আটকে থাকায় অনেক কোম্পানি ব্যাংক ঋণের দায়ে খেলাপি হয়ে পড়েছে। বকেয়া পরিশোধ করা হলে বেসরকারি খাত নিজ উদ্যোগে তেল আমদানি করে উৎপাদন চালু করতে পারবে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, দেশে চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি থাকায় এখনো ব্যাপক লোডশেডিং চলছে। সম্প্রতি দেশের বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজারের বেশি মেগাওয়াট থাকলেও সরবরাহ করা হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটের মতো, যার ফলে দুই হাজারের বেশি মেগাওয়াট লোডশেডিং পোহাতে হয়েছে। জ্বালানি বিভাগ জানিয়েছে, ১ সেপ্টেম্বরের আগে গ্যাসের সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব নয় এবং তেলের ঘাটতির কারণে গ্যাসের ওপর থেকেও নির্ভরতা কমানো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে ১ সেপ্টেম্বরের আগে শিল্প খাতে স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না।
মন্তব্য করুন