|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : Jun 9, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

ধর্ষণ প্রমাণে ৪ সাক্ষী কি বাধ্যতামূলক? যা বললেন জাকির নায়েক

ডা. জাকির নায়েক। ছবি: সংগৃহীত

ধর্ষণ পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে জঘন্য, পৈশাচিক এবং মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর একটি। এই অপরাধ শুধু একজন নারীর শরীরকে ক্ষতবিক্ষত করে না; বরং তার আত্মমর্যাদা, স্বাধীন নিরাপত্তাবোধ এবং মানসিক জগতকেও চিরতরে ধ্বংস করে দেয়। তবে সমসাময়িক বিশ্বে ইসলামের বিচারব্যবস্থার বিরুদ্ধে প্রায়ই একটি নেতিবাচক অভিযোগ তোলা হয়— ইসলামের অধীনে নাকি ধর্ষণের শিকার কোনো নারীকে ন্যায়বিচার পেতে হলে চারজন প্রত্যক্ষদর্শী পুরুষ সাক্ষী হাজির করতে হয়! সাধারণ মানুষের একাংশের কাছে বিষয়টি এতটাই অবাস্তব মনে হয় যে, তারা ইসলামি আইনকে আধুনিক যুগের অনুপযোগী বা কঠোর বলে মনে করেন।

তবে আন্তর্জাতিক ইসলামি স্যাটেলাইট ও ইন্টারনেট টেলিভিশন হুদা টিভির (Huda TV) এক বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠানে এই বিষয়ে সম্পূর্ণ কুরআন ও সুন্নাহভিত্তিক বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিয়েছেন প্রখ্যাত ইসলামি স্কলার ডা. জাকির নায়েক। তিনি অত্যন্ত অকাট্য প্রমাণসহ জানিয়েছেন, এটি ইসলামের বিধান সম্পর্কে সমাজে বহুল প্রচলিত একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ও অজ্ঞতা।

চার সাক্ষীর বিধান মূলত কোথায় প্রযোজ্য?

অনুষ্ঠানে এক প্রশ্নের জবাবে ডা. জাকির নায়েক বলেন, "অনেক মুসলিম ও অমুসলিম না জেনে মনে করেন যে ইসলামি শরিয়তে ধর্ষণ প্রমাণ করার জন্য চারজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী প্রয়োজন। এটি সম্পূর্ণ ভুল। মানুষ মূলত 'জিনা' বা স্বেচ্ছায় ব্যভিচারের অভিযোগ প্রমাণের শর্তের সঙ্গে 'ধর্ষণ' বা জোরপূর্বক শারীরিক নির্যাতনের বিষয়টিকে গুলিয়ে ফেলেছে।"

ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী, কেউ যদি সমাজ বা আদালতে কোনো পবিত্র, চরিত্রবান ও নির্দোষ নারীর বিরুদ্ধে ব্যভিচারের (জিনা) মিথ্যা অপবাদ বা অভিযোগ আনে, তবে সেই অভিযোগ সত্য প্রমাণ করতে অভিযোগকারীকে অবশ্যই চারজন সৎ ও প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী হাজির করতে হবে। যদি সে তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে অভিযোগকারী নিজেই চরম শাস্তিযোগ্য অপরাধী হবে। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন—

$$\text{وَالَّذِينَ يَرْمُونَ الْمُحْصَنَاتِ ثُمَّ لَمْ يَأْتُوا بِأَرْبَعَةِ شُهَدَاءَ فَاجْلِدُوهُمْ ثَمَانِينَ جَلْدَةً}$$

“আর যারা সতী-সাধ্বী নারীদের বিরুদ্ধে অপবাদ আরোপ করে, অতঃপর চারজন সাক্ষী উপস্থিত করতে পারে না, তাদের ৮০ (আশি) বেত্রাঘাত করো।” (সুরা আন-নূর: আয়াত ৪)

অর্থাৎ, ইসলামে চার সাক্ষীর এই কঠোর শর্তটি ধর্ষণের শিকার কোনো ভুক্তভোগীর জন্য নয়; বরং কোনো নারীর চরিত্র নিয়ে সমাজে কাদা ছিটানো এবং ব্যভিচারের অপবাদ দেওয়ার পথ বন্ধ করতে রাখা হয়েছে।

ইসলামের দৃষ্টিতে ধর্ষণ ও জিনা এক নয়

ডা. জাকির নায়েক স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "জিনা বা সাধারণ ব্যভিচার সংঘটিত হয় নর-নারীর উভয় পক্ষের পারস্পরিক সম্মতিতে। কিন্তু ধর্ষণের ক্ষেত্রে একজনের ওপর সম্পূর্ণ জোরপূর্বক পাশবিক শারীরিক সম্পর্ক চাপিয়ে দেওয়া হয়। এখানে একজন শতভাগ অপরাধী এবং অন্যজন মজলুম বা ভুক্তভোগী।"

তাই ইসলামি আইনবিদ ও ফকিহরা ধর্ষণকে সাধারণ ব্যভিচার হিসেবে দেখেননি; বরং একে ‘হিরাবাহ’ (সমাজে ভয়, সশস্ত্র সন্ত্রাস, ডাকাতি ও নৈরাজ্য সৃষ্টির অপরাধ) এর অন্তর্ভুক্ত বলে বিবেচনা করেছেন। এই প্রসঙ্গে ফকিহরা কুরআনের একটি কঠোর আয়াত উদ্ধৃত করেন—

$$\text{إِنَّمَا جَزَاءُ الَّذِينَ يُحَارِبُونَ اللَّهَ وَরَسُولَهُ وَيَسْعَوْنَ فِي الْأَرْضِ فَسَادًا أَنْ يُقَتَّلُوا أَوْ يُصَلَّبُوا أَوْ تُقَطَّعَ أَيْدِيهِمْ وَأَرْجُلُهُمْ مِنْ خِلَافٍ أَوْ يُنْفَوْا مِنَ الْأَرْضِ}$$

“যারা আল্লাহ ও তার রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং পৃথিবীতে ফাসাদ (নৈরাজ্য/সন্ত্রাস) সৃষ্টির চেষ্টা করে, তাদের শাস্তি হলো— হত্যা করা, অথবা ক্রুশবিদ্ধ করা, অথবা বিপরীত দিক থেকে হাত-পা কেটে ফেলা, অথবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা।” (সুরা আল-মায়েদাহ: আয়াত ৩৩)

আইনবিদদের মতে, ধর্ষণ সমাজের নারীদের মধ্যে চরম ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে। তাই এটি পৃথিবীর বুকে ফাসাদ বা হিরাবাহর আওতাধীন একটি সর্বোচ্চ শাস্তিযোগ্য রাষ্ট্রীয় অপরাধ।

ধর্ষণ প্রমাণে আধুনিক ও পারিপার্শ্বিক আলামতের গ্রহণযোগ্যতা

ডা. জাকির নায়েকের ভাষ্য অনুযায়ী, ধর্ষণের অপরাধ প্রমাণের জন্য চারজন সাক্ষীর কোনোই বাধ্যবাধকতা ইসলামে নেই। এই ক্ষেত্রে বিজ্ঞ বিচারক বা আদালতের সামনে নিচের উপাদানগুলো চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হতে পারে:

প্রমাণের ধরণইসলামি আদালতে এর গ্রহণযোগ্যতা ও ভূমিকা
পরিস্থিতিগত আলামতভুক্তভোগীর তাৎক্ষণিক মৌখিক সাক্ষ্য, শরীরের জখম এবং ধস্তাধস্তির চিহ্ন।
ফরেনসিক ও মেডিকেলআধুনিক ডিএনএ (DNA) টেস্ট, মেডিকেল বা ফরেনসিক রিপোর্ট এবং বৈজ্ঞানিক আলামত।
পারিপার্শ্বিক প্রমাণঅপরাধস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ, ডিজিটাল ট্র্যাকিং বা যেকোনো প্রকার ডিজিটাল ডিভাইস (Circumstantial Evidence)।

সমস্ত প্রমাণ ও আলামত পর্যালোচনার পর বিচারক যদি নিশ্চিত হন যে অভিযুক্ত ব্যক্তিই এই জঘন্য অপরাধটি করেছে, তবে তার বিরুদ্ধে ইসলামি দণ্ডবিধি অনুযায়ী মৃত্যুদণ্ডসহ কঠোরতম শাস্তি কার্যকর করা হবে।

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের ঐতিহাসিক নজির ও ন্যায়বিচার

ডা. জাকির নায়েক প্রামাণ্য দলিল হিসেবে আবু দাউদ ও ইবনে মাজাহ শরিফে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগের একটি সত্য ঘটনা উল্লেখ করেন:

মদিনায় একবার এক নারী রাতের অন্ধকারে সালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে মসজিদে যাওয়ার পথে এক দুর্বৃত্ত দ্বারা ধর্ষণের শিকার হন। ধর্ষক পালিয়ে যাওয়ার পর ওই নারী অন্ধকারবশত অন্য এক ব্যক্তিকে অপরাধী মনে করে চিৎকার করেন। লোকজন সেই নির্দোষ ব্যক্তিকে ধরে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে নিয়ে আসে। কিন্তু শাস্তি কার্যকর হওয়ার ঠিক পূর্বমুহূর্তে প্রকৃত অপরাধী বিবেকতাড়িত হয়ে জনসমক্ষে নিজের অপরাধ স্বীকার করে।

তখন আল্লাহর রাসুল (সা.) নির্দোষ ব্যক্তিটিকে তৎক্ষণাৎ মুক্তি দেন এবং প্রকৃত ধর্ষকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির নির্দেশ জারি করেন।

এই ঐতিহাসিক বিচার বিভাগীয় ঘটনা থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, রাসুলুল্লাহ (সা.) ভুক্তভোগী নারীর কাছে কোনো প্রকার চারজন সাক্ষী দাবি করেননি। বরং নারীর অভিযোগ ও পরিস্থিতিগত আলামতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই রাষ্ট্রীয় বিচারিক প্রক্রিয়া চালানো হয়েছিল।

পরিশেষে, ইসলাম সর্বদা অত্যাচারীর বিরুদ্ধে এবং নির্যাতিতের অধিকার প্রতিষ্ঠার পক্ষে অবস্থান নেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মজলুমের (নির্যাতিতের) বদদোয়া থেকে বেঁচে থাকো। কারণ তার দোয়া ও আল্লাহর মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।” (সহিহ বুখারি)। অতএব, ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল বিষয়ে প্রচলিত ভুল ধারণা পরিহার করে কুরআন, সুন্নাহ ও ইসলামিক আইনশাস্ত্রের মূল স্পিরিট বোঝা আমাদের সবার জন্য জরুরি।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

মেলোনির বিরুদ্ধে ‘রেস্ট্রেইনিং অর্ডার’ চেয়ে ট্রাম্পের অদ্ভুত

1

জ্বালানি তেলের ব্যবসায় কোনো একক কোম্পানি নয়, সবাই সমান সুযোগ

2

২৭ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে কারাবন্দি আ.লীগ নেতাকে ছাড়ানোর অভিযোগ স

3

মন্টেরে লিগস কাপ ২০২৬-এর সেমিফাইনালে: প্রতিপক্ষ কে হতে পারে?

4

বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণ ও ভবিষ্যৎ পরিবর্তন

5

আল-কায়েদার তৎপরতা নিয়ে জাতিসংঘের রিপোর্ট অনুমাননির্ভর,

6

কলকাতায় কি হামলার শিকার মোশাররফ করিম? সত্যিটা জানালেন স্ত্র

7

ব্রাজিলে মুসলমানদের ইতিহাস: সংগ্রাম, আত্মত্যাগ ও বর্তমান সাফ

8

শেয়ারবাজারে মার্জিন বিধিমালার সংশোধনী গেজেট প্রকাশ, ঋণের শর্

9

বান্দরবানে অস্ত্র ও গুলিসহ কেএনএফ সদস্য আটক

10

বিএনপি গণভোটের রায় ও ৩১ দফার অঙ্গীকার থেকে সরে এসেছে: আখতার

11

ভূ-রাজনীতি নয়, অর্থনীতিই বাংলাদেশের বৈদেশিক নীতির মূল ভিত্তি

12

হামের প্রাদুর্ভাব অব্যাহত: ২৪ ঘণ্টায় ৩ শিশুর মৃত্যু, আক্রান্

13

পোশাক খাতের সমস্যা সমাধানে বিজিএমইএ-র কাছে সুপারিশ চাইলেন অর

14

এমবাপে বনাম ইয়ামাল: বিশ্বকাপ ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি ফ্

15

অরুণাচলে ভয়াবহ ভূমিধস: নির্মাণ শ্রমিকদের মৃত্যুতে শোকের ছায়া

16

সেনেগালের বিপক্ষে বেলজিয়ামের পেনাল্টি: সঠিক সিদ্ধান্ত না কি

17

গালার্জার রেকর্ড গোল, মেতেছে প্যারাগুয়ে

18

ধর্ষণ প্রমাণে ৪ সাক্ষী কি বাধ্যতামূলক? যা বললেন জাকির নায়েক

19

বার কাউন্সিলের প্রথম রিভিউ বাতিল অবৈধ: হাইকোর্ট

20