বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হকের রাজনৈতিক অবস্থান ও আকিদাগত মন্তব্য নিয়ে মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরীর পাঠানো ৬ পৃষ্ঠার চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন মামুনুল হকের তিন মুরুব্বি। এ বিষয়ে লিখিত জবাবের চেয়ে সরাসরি মুখোমুখি আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন তারা।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের (বাখেম) আমির মাওলানা মামুনুল হকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে কওমি অঙ্গনে চলমান আলোচনার মধ্যে এবার মুখ খুললেন তাঁর তিন মুরুব্বি বা উপদেষ্টা। হবিগঞ্জের মাদরাসা নূরে মদিনার পরিচালক ও বিশিষ্ট আলেম মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরীর পাঠানো ৬ পৃষ্ঠার দীর্ঘ চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করে গণমাধ্যমের কাছে নিজেদের প্রাথমিক অবস্থান তুলে ধরেছেন তারা।
সিলেটের ঐতিহাসিক আলিয়া মাদরাসা মাঠে খাদিমুল কোরআন পরিষদের তাফসির মাহফিলে মাওলানা মামুনুল হককে অতিথি করা নিয়ে আলেমদের একটি অংশের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কওমি ঐতিহ্য ও আকিদা সুরক্ষার লক্ষে ওলীপুরী এই চিঠি পাঠান।
তিন মুরুব্বির প্রতিক্রিয়া: এর আগে মাওলানা মামুনুল হক ঘোষণা দিয়েছিলেন যে, তাঁর কোনো বক্তব্যে কারো আপত্তি থাকলে তা যেন তাঁর ‘তিন মুরুব্বির’ কাছে পেশ করা হয় এবং তাদের ফয়সালা তিনি মেনে নেবেন। সেই নির্দেশনা অনুযায়ী রাজধানীর মিরপুরের মাদরাসা দারুর রাশাদের শিক্ষাসচিব মাওলানা লিয়াকত আলী, গাজীপুরের অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী (দেওনার পীর) এবং বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশের মহাসচিব মাওলানা মাহফুজুল হকের কাছে চিঠিটি পাঠানো হয়।
মাওলানা লিয়াকত আলী: চিঠি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি জানান, ব্যক্তিগত অসুস্থতা ও ব্যস্ততার কারণে শুরুতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে। তিনজন মুরুব্বি একসঙ্গে বসে পরামর্শ করে পরবর্তীতে এ বিষয়ে সম্মিলিত জবাব দেবেন বলে জানান তিনি।
মাওলানা মাহফুজুল হক: তিনি জানান, চিঠিতে যেসব তাত্ত্বিক বিষues অবতারণা করা হয়েছে, তা কেবল লিখিতভাবে জবাব দেওয়ার মতো নয়; বরং বিষয়টি সরাসরি মুখোমুখি বসে আলোচনার দাবি রাখে। উপযুক্ত সময়ে সবার অংশগ্রহণে সাক্ষাতে বসে এই বিষয়ের সুরাহা হওয়া উচিত বলে মত দেন তিনি।
অধ্যক্ষ শাহ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী: তিনিও চিঠি পাওয়ার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। তবে বর্তমানে ব্যক্তিগত কাজে বাইরে থাকায় চিঠিটি বিস্তারিত পর্যালোচনা করে পরবর্তীতে নিজের মতামত জানাবেন বলে উল্লেখ করেন।
চিঠিতে ওলীপুরীর প্রধান আপত্তি ও প্রশ্নসমূহ: মাওলানা নুরুল ইসলাম ওলীপুরী তাঁর ৬ পৃষ্ঠার চিঠিতে দেওবন্দি আকিদা ও কওমি ঐতিহ্য রক্ষার তাগিদে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ও তাত্ত্বিক প্রশ্ন তুলেছেন: ১. আকিদাগত তুলনা: চার মাজহাবের সাথে সালাফি ও মওদুদীবাদের আকিদাকে এক কাতারে ফেলার ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে তিনি জানান, মৌলিক ও ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। ২. ‘দাঁড়িপাল্লা’ মার্কা বিতর্ক: নির্বাচনী প্রচারে মওদুদীবাদের দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’কে ইনসাফ ও ওলামায়ে কেরামের প্রতীক হিসেবে আখ্যা দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করা হয়েছে। ৩. দেওবন্দি আকিদা সংশোধন: মাওলানা মামুনুল হক কর্তৃক দেওবন্দি ও হানাফিদের আকিদা সংশোধনের আহ্বানকে শতবছরের ঐতিহ্যের ওপর আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৪. রাজনৈতিক ঐক্য ও ইতিহাস: মওদুদীবাদীদের সাথে রাজনৈতিক ঐক্যকে শায়খুল হিন্দ (রহ.)-এর কংগ্রেসের সাথে ঐক্যের নজির হিসেবে উপস্থাপনের বিরোধিতা করে চিঠিতে বলা হয়, শায়খুল হাদিস মাওলানা আজিজুল হক (রহ.) বইয়ে মওদুদীবাদের নানা ভ্রান্তির দলিলভিত্তিক খণ্ডন করে গেছেন। ৫. ‘আকিদাতুল জিহাদিয়া’ পরিভাষা: জিহাদকে মূল আকিদা হিসেবে উপস্থাপন ও এই পরিভাষা ব্যবহারের শাস্ত্রীয় ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
কওমি অঙ্গনের শীর্ষ স্থানীয় আলেমদের এই মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব ও মতপার্থক্য নিরসনে শেষ পর্যন্ত মুরুব্বিরা কী ধরনের সিদ্ধান্ত নেন, সেদিকেই এখন নজর রয়েছে সংশ্লিষ্ট মহলের।