প্রতিবেশী দুই দেশের কূটনীতিতে একটি মাত্র ইমেইল অনেক সময় অনেক না বলা কথা প্রকাশ করে দেয়। চলতি মাসের শুরুর দিকে ভারতের রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে হঠাৎ ভুলবশত একটি ইমেইল চলে আসে, যেখানে জানানো হয় যে বাংলাদেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সংবর্ধনা উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রস্তুতি চলছে। যদিও কিছুক্ষণের মধ্যেই সেই ইমেইল প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়, তবুও এই ঘটনাটি স্পষ্ট করে দিয়েছে যে দিল্লি কতটা উদগ্রীব হয়ে আছে বাংলাদেশের নতুন সরকারকে বরণ করে নেওয়ার জন্য। ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের পর তারেক রহমান ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই ভারত তার সঙ্গে সম্পর্ক নতুন করে জোড়া লাগানোর জন্য একের পর এক কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে এই আমন্ত্রণে সাড়া দেওয়া নিয়ে ঢাকা এখনো বেশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। শেখ হাসিনার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্কে যে শৈত্যপ্রস্তর তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ দেখছে দিল্লি। কিন্তু সবচেয়ে বড় কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশের একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে ফেরত পাঠানোর জন্য ঢাকা বারবার তাগিদ দিলেও দিল্লি এখনো সে বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। উল্টো গত ৫ আগস্ট দিল্লিতে বসে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল বক্তব্য ও রাজনীতিতে ফেরার হুংকার বাংলাদেশে চরম ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে। ফলে ঘরের মাঠে রাজনৈতিক চাপের মুখে পড়ে তারেক রহমানের জন্য এখনই হুট করে দিল্লি সফর করা বেশ কঠিন এক সিদ্ধান্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু হাসিনাকে ঘিরে তৈরি হওয়া জটিলতাই নয়, ভারতের এই উদ্বেগের পেছনে রয়েছে বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক সমীকরণ। ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই বাংলাদেশের সঙ্গে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়টি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে নয়াদিল্লি। সম্প্রতি সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যকার আলোচিত ‘মক্কা চুক্তি’ বা যৌথ প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রতি বাংলাদেশের বর্তমান প্রশাসনের ইতিবাচক মনোভাবও ভারতের কপালে ভাঁজ ফেলেছে। এছাড়া উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর নিরাপত্তা এবং চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্ত সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল বিষয়গুলোর জন্য দিল্লির কাছে ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা এক প্রকার কৌশলগত বাধ্যবাধকতা।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের নীতিতেও স্পষ্ট যে তারা আর কোনো বড় শক্তির ওপর একপেশেভাবে নির্ভরশীল থাকতে চায় না। ভারত ইতিমধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ এবং চিকিৎসা ভিসার মতো বিষয়গুলোতে সহযোগিতা বাড়িয়ে সদিবসের প্রমাণ দেওয়ার চেষ্টা করলেও, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝিতে ব্রিকস সম্মেলন বা জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বৈঠকের ফাঁকে এই বরফ গলবে কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। প্রতিবেশী দুই দেশের এই টানাপোড়েন শেষ পর্যন্ত কোন দিকে মোড় নেয় এবং সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই দৌড়ে কূটনীতি শেষ হাসি হাসে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
মন্তব্য করুন