ফুটবল মাঠে বয়সের হিসাবটা অনেক সময় কেবলই একটি সংখ্যা। যখন বল লামিন ইয়ামালের বাঁ পায়ে এসে থামে, তখন গ্যালারির হাজারো দর্শক যেন মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। স্পেন যদি একটি রঙিন ক্যানভাস হয়, তবে ইয়ামাল তার সবচেয়ে দুরন্ত তুলির আঁচড়। আর এই স্পেন যদি হয় কোনো কবিতা, তবে সেই কিশোর তার বাঁ পায়ে লেখা এক অনন্য পঙ্ক্তি। বিশ্বকাপের মতো মহাকাশসম মঞ্চে এখন একটি ছোট্ট নক্ষত্র আলো ছড়াচ্ছে, আর তাকে দেখেই বড় বড় তারকারা খুঁজে নিচ্ছেন নতুন অনুপ্রেরণা।
সামনে পৃথিবীর সেরা ডিফেন্ডার কিংবা কাঁধে দেশের বিশাল প্রত্যাশা কোনো কিছুই যেন ছুঁতে পারে না ইয়ামালকে। তার চোখেমুখে নেই কোনো ভয়, বরং আছে পাড়ার মাঠে বন্ধুদের সঙ্গে খেলার অকৃত্রিম আনন্দ। বল পায়ে যখন তিনি ড্রিবল করেন, তখন তা কোনো কৌশল নয়, বরং ফুটবলের এক ছবি আঁকার গল্প হয়ে ওঠে। তিনি কী করবেন, তা প্রতিপক্ষ তো দূরের কথা, অনেক সময় হয়তো ইয়ামাল নিজেও আগে থেকে ভাবেন না। আর এখানেই তার ফুটবলের আসল সৌন্দর্য।
২০০৭ সালের ১৩ জুলাই জন্মগ্রহণ করা এই কিশোরের রক্তে মিশে আছে তিনটি সংস্কৃতির ছোঁয়া। বাবা মরক্কোর, মা নিরক্ষীয় গিনির, আর ফুটবলীয় পরিচয় পেয়েছে স্পেনের মাটিতে। শৈশব কেটেছে বার্সেলোনার কাছের সাধারণ এক জনপদে, রোকাফোন্দায়। গোল উদ্যাপনের সময় দুই আঙুলে ‘৩০৪’ প্রতীক ফুটিয়ে তুলে তিনি বুঝিয়ে দেন, সাফল্যের শিখরে পৌঁছেও তিনি নিজের শিকড়কে ভোলেননি। বার্সেলোনার বিখ্যাত লা মাসিয়ায় গড়ে ওঠা এই প্রতিভার শিক্ষা ও সহজাত দক্ষতার সংমিশ্রণই তাকে করে তুলেছে বর্তমান ফুটবলের সবচেয়ে বিপজ্জনক খেলোয়াড়দের একজন।
তাকে অনেকেই মেসির সাথে তুলনা করেন, কিন্তু ইয়ামাল কারো ছায়া হতে চান না। তিনি নিজের গল্পের প্রথম সংস্করণ লিখছেন। বয়সের সাথে সাথে মানুষ সাধারণত হারানো বা সমালোচনার ভয় শেখে, কিন্তু ইয়ামালের ফুটবলে সেই ভয়ের লেশমাত্র নেই। ২০২৪ ইউরোতে ফ্রান্সের বিপক্ষে তার সেই অনবদ্য গোলটি ছিল অভিজ্ঞতার দাপটের বিরুদ্ধে কৈশোরের বিদ্রোহ। স্পেন এখন কেবল পাসের অন্তহীন সংগীতে বিশ্বাসী নয়, তারা এখন দুই প্রান্ত থেকে আগুনের মতো আক্রমণ করতেও জানে। নিকো উইলিয়ামস আর ইয়ামালের গতি প্রতিপক্ষের রক্ষণে যে ত্রাস সৃষ্টি করে, তা আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা দৃশ্য।
বিশ্বকাপের মঞ্চ নিষ্ঠুর হতে পারে, যেখানে একটি ভুলের মাশুল দিতে হয় কয়েক বছরের অপেক্ষায়। তবে ইয়ামালকে দেখে মনে হয়, তার কাঁধে কোনো ভারই নেই। গ্যালারিতে বসা শিশুটি যখন ইয়ামালকে দেখে স্বপ্ন দেখে, তখন প্রজন্ম বদলালেও ফুটবলের প্রতি সেই ভালোবাসা বদলায় না। সাফল্যের করতালি কিংবা ব্যর্থতার সমালোচনা ফুটবল কাউকে শুধু ফুলের বিছানা দেয় না, তা ভালোভাবেই জানা আছে তার। তবু এই কিশোরের পায়ে আছে লা মাসিয়ার শিক্ষা, চোখে বড় স্বপ্ন আর বুকের ভেতর বয়াতীত সাহস। বিশ্বকাপ ট্রফি কার হাতে উঠবে তা সময়ের গর্ভে তোলা থাকলেও, ইয়ামাল যে ফুটবলের এক নতুন কবিতার জন্ম দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
মন্তব্য করুন