ভারতের মধ্যপ্রদেশে এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় ১৪ জন স্বঘোষিত ‘গোরক্ষককে’ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার পর বিচারক তাবাসসুম খান চরম বিদ্বেষ ও হুমকির শিকার হয়েছেন। ২০২২ সালে গরু পাচারের সন্দেহে নজির আহমদ নামক এক ব্যক্তিকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় গত ১২ জুন বিচারক তাবাসসুম খান এই ঐতিহাসিক রায় প্রদান করেন। রায়ে তিনি এটিকে ‘স্পষ্ট গণপিটুনির ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করে দণ্ডপ্রাপ্তদের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
রায় ঘোষণার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিচারককে নিয়ে শুরু হয় চরম বিদ্বেষমূলক প্রচারণা। বিচারকের ধর্মীয় পরিচয়কে সামনে রেখে বিভিন্ন ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদী প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংগঠনের পক্ষ থেকে তাকে ধর্ষণ ও হত্যার হুমকি দেওয়া হয়েছে। এমনকি একটি ভিডিও বার্তায় দণ্ডপ্রাপ্তদের ১০ দিনের মধ্যে মুক্তি না দিলে দেশে ‘রক্তপাত’ ঘটানোর হুমকিও দেওয়া হয়েছে। এছাড়া পাঞ্জাব ও উত্তরপ্রদেশে বিভিন্ন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনের উদ্যোগে বিচারকের কুশপুত্তলিকা পোড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এই ঘটনায় ভারতের সচেতন মহলে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মার্কণ্ডে কাটজু মন্তব্য করেছেন যে, এটি কেবল রায়ের সমালোচনা নয়, বরং বিচারকের ধর্মীয় পরিচয়কে ব্যবহার করে তার বিচারিক কর্তৃত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন (এসসিবিএ) ও অ্যাডভোকেটস-অন-রেকর্ড অ্যাসোসিয়েশন (এসসিএওআরএ) এই ঘটনাকে গণতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনক হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, বিচারকদের নির্ভয়ে কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হুমকিদাতাদের অবিলম্বে আইনের আওতায় আনতে হবে।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট বিচারক তাবাসসুম খানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কাছে জবাবদিহি চেয়েছে এবং তার জন্য পুলিশি নিরাপত্তা বহাল রাখার নির্দেশ দিয়েছে। পুলিশ জানিয়েছে, এরই মধ্যে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং উসকানিমূলক ভিডিও প্রচারের অভিযোগে দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। সাইবার ইউনিট সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওগুলোর উৎস শনাক্তে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। একজন বিচারক আইন অনুযায়ী রায় প্রদানের পর এ ধরনের সাম্প্রদায়িক হামলার শিকার হওয়া ভারতীয় বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতার ওপর একটি বড় প্রশ্নচিহ্ন এঁকে দিয়েছে।
বিচারকের দেওয়া আইনানুগ রায়ের প্রতিবাদে ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ব্যক্তিগত হুমকির মতো ঘটনা কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় আঘাত হানা বলে আপনি মনে করেন?
মন্তব্য করুন