দীর্ঘদিন ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এখন চরম সংকটের মুখে। বিদ্যুত ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধি জনজীবনে ব্যয়ভার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এর মধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল বা বেতন বৃদ্ধির আভাস আসায় এক ধরনের বৈষম্য ও হতাশা তৈরি হয়েছে সাধারণ কর্মজীবী মানুষের মাঝে। অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে সরকারি সুবিধাভোগী মাত্র ১৪ লাখের সামান্য বেশি। ফলে বাকি বিশাল জনগোষ্ঠীর আয় না বাড়ায় নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্যের বোঝা তাদের কাঁধেই সবচেয়ে বেশি পড়ছে।
বাজার পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ঈদের পর বাজারে পণ্যের দাম কমার পরিবর্তে বরং তা উর্ধ্বমুখী। চাল, ডাল, মাছ, মাংস ও সবজির দাম সাধারণের নাগালের বাইরে চলে গেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যমতে, মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও তা এখনো ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। অর্থনীতিবিদ ড. মাহফুজ কবীর সতর্ক করেছেন যে, নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের ফলে সরকারি চাকরিজীবীরা কিছুটা স্বস্তি পেলেও, এটি অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতি ও সামাজিক বৈষম্য বাড়িয়ে দিতে পারে। যদি যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া বেতন বাড়ানো হয়, তবে তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সীমিত আয়ের মানুষদের ওপর।
বাজারে নিত্যপণ্যের দামে আগুন লেগেছে বললেই চলে। সরু চাল ৮৫-৯০ টাকা এবং ব্রয়লার মুরগি ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস ৮৫০ টাকা ও খাসির মাংস ১২০০ টাকায় কিনতে গিয়ে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতাদের নাভিশ্বাস উঠছে। সবজির বাজারেও স্বস্তির কোনো খবর নেই, বেগুনসহ অন্যান্য সবজি ৮০-১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। মালিবাগ বাজারের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী হাসনাত আক্ষেপ করে জানান, ৩৫ হাজার টাকা বেতনে ছয় সদস্যের সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সরকারি কর্মচারীরা স্বাচ্ছন্দ্যে থাকলেও সাধারণ বেসরকারি কর্মীরা প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই করছেন।
সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান মনে করেন, মূল্যস্ফীতির চাপে সবাই পিষ্ট, তাই কেবল একটি গোষ্ঠীর বেতন বৃদ্ধি সমস্যার সমাধান নয়। সরকারের উচিত টিসিবির মাধ্যমে ভর্তুকি মূল্যের পণ্যের সরবরাহ বাড়ানো এবং বাজারের অসাধু সিন্ডিকেট ভেঙে নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে আনা। ক্যাবের ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইনও অসাধু ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণ করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির ঘোষণা সময়ের দাবি হলেও, দেশের সামগ্রিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতা ও সকল শ্রেণির মানুষের জীবনমান উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা গ্রহণ এখন অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন