কিছু শহর শুধু মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং তা একটি দেশের ক্রীড়া স্মৃতির গভীরতম অংশে চিরস্থায়ী আসন গড়ে নেয়। বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো তেমনই এক নস্টালজিয়ার নাম, যার বাতাসে আজও লুকিয়ে আছে একটি রুপার ঝলক, একটি মিষ্টি আক্ষেপ আর একটি অসমাপ্ত স্বপ্নের গল্প। ২০১৪ সালের ২৯ জুলাই গ্লাসগোর শুটিং রেঞ্জে দাঁড়িয়ে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে রুপা জিতে ইতিহাস গড়েছিলেন শ্যুটার আবদুল্লাহ হেল বাকির। যদিও সেদিন সোনা হাতছাড়া হওয়ায় জাতীয় সংগীত বাজেনি, তবুও লাল-সবুজ পতাকা পদকের মঞ্চে উড়তে দেখে গর্ভে বুক ভরে উঠেছিল পুরো জাতির। চার বছর পর গোল্ড কোস্টে বাকি আবারও রুপা জয় করলেও, গ্লাসগোর সেই বিকেলের আবেগ ও রোমাঞ্চ ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। ১২ বছর পর সেই চিরচেনা শহরেই এবার নতুন পরিচয়ে ফিরছে বাংলাদেশ।
তবে সময়ের বিবর্তনে অনেক কিছুই বদলে গেছে। ২০১৪ সালের সেই দল আর বর্তমান বাংলাদেশ দলের মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ রয়েছে। কমনওয়েলথ গেমসের এবারের আসরে বাংলাদেশের সবচেয়ে সফল ডিসিপ্লিন শুটিংকে ছাড়াই ১৫ সদস্যের একটি নতুন দল চারটি ভিন্ন ডিসিপ্লিনে লড়তে যাচ্ছে। অ্যাথলেটিকস ইভেন্টে দেশের প্রতিনিধিত্ব করবেন ইমরানুর রহমান, শিরিন আক্তার, স্বপ্না খাতুন, লুশাদ ইসলাম ও নজিমুল হোসেন রাফি। সাঁতারের মঞ্চে লড়াইয়ে নামবেন সোনিয়া আক্তার, কাজল মিয়া, সামিউল ইসলাম রাফি ও জিন্নাত ফেরদৌস। এছাড়া বক্সিংয়ে জিন্নাত ফেরদৌস, রাকিব হোসেন ও রুহিন রেজা এবং শৈল্পিক জিমন্যাস্টিকসে শিশির আহমেদ, রাজীব চাকমা ও আবু সাঈদ রাফি নিজেদের সেরাটা দিতে প্রস্তুত রয়েছেন। এই তরুণ অ্যাথলেটদের কাঁধে পদক জয়ের পাহাড়সম চাপের চেয়েও বড় দায়িত্ব হলো বিশ্বমঞ্চে লাল-সবুজ পতাকার সুমহান প্রতিনিধিত্ব করা।
শহরটি অপরিবর্তিত থাকলেও গ্লাসগোও গত এক দশকে আধুনিক রূপ ধারণ করেছে। ২০১৪ সালের সেল্টিক পার্কের পরিবর্তে এবারের আসরের জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে ওভিও হাইড্রো অ্যারেনায়। বুধবার থেকে শুরু হয়ে আগামী ২ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই প্রতিযোগিতায় বিশ্বের ৭৪টি দেশ ও অঞ্চলের প্রায় তিন হাজার ক্রীড়াবিদ ১০টি খেলা ও ছয়টি প্যারা ডিসিপ্লিনের মোট ২১৫টি স্বর্ণপদকের জন্য একে অপরের মুখোমুখি হবেন। প্রজন্ম বদলায়, খেলার মাঠ বদলায়, কিন্তু লাল-সবুজ পতাকার জয়যাত্রার স্বপ্ন এক বিন্দুও বদলায় না। হয়তো গ্লাসগোর কোনো এক বিকেলে নতুন কোনো মুখ লিখে ফেলবে সোনালী অধ্যায়, কিংবা হয়তো পদক আসবে না তবুও বিশ্বমঞ্চে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে লড়াই করার এই সাহস ও প্রত্যয়ই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্জন। ১২ বছর আগে গ্লাসগো দেশকে যে উজ্জ্বল স্মৃতি উপহার দিয়েছিল, সেই শহরটি এবার হয়তো কেবল ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি নয়, বরং সম্পূর্ণ নতুন এক ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায় দিন গুনছে।
মন্তব্য করুন