ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবসে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় আয়োজিত লালন উৎসবে লালনের শুদ্ধাচার, দর্শন ও মানবপ্রেম নিয়ে কথা বলেছেন বাউল সাধক হৃদয় শাহ।
মানবিকতার মহান সাধক ও দার্শনিক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে কুষ্টিয়ার ঐতিহ্যবাহী ছেঁউড়িয়া লালন ধামে শুরু হয়েছে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন লালন উৎসব ও সাধুর মেলা। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি চত্বরে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠানমালা চলবে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত। মূল আনুষ্ঠানিকতার পাশাপাশি পুরো আখড়াবাড়ি এখন লালন সাঁইয়ের অগণিত অনুরাগী, বাউল-সাধক এবং দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীদের এক অভূতপূর্ব মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে।
সুদীর্ঘ ৩৫ বছর ধরে সাঁইজির অসাম্প্রদায়িক বাণী ও সাধনপথ অনুসরণ করে চলা কুষ্টিয়ার স্থানীয় প্রবীণ বাউল সাধক হৃদয় শাহের সঙ্গে কথা হলে উঠে আসে সাঁইজির আধ্যাত্মিক পরিক্রমার অন্তর্নিহিত রীতিনীতি। গুরু পরম্পরার ঐতিহ্যবাহী ধারা তুলে ধরে তিনি জানান যে, সন্ধ্যায় মূল অধিবাসের মধ্য দিয়ে বাউলদের আত্মিক ধর্মীয় পর্বের কাজ শুরু হয়। এরপর রাতব্যাপী সাধন-সঙ্গীতের আসর, পরদিন ভোরে বাল্য সেবা এবং দুপুরে পূর্ণ সেবার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে এই ঐতিহ্যগত সাধুসঙ্গের সমাপ্তি ঘটে।
কেবল মেলায় ঘুরে যাওয়া বা ক্ষণিকের বিনোদনের মধ্যে লালন শিক্ষার প্রকৃত নির্যাস পাওয়া সম্ভব নয় উল্লেখ করে হৃদয় শাহ জানান যে, সাঁইজির প্রতিটি বাণী ও গান মানুষের জীবনকে পরিশুদ্ধ করার এক মহা ঔষুধ। সাধকেরা লালন সাঁইকে বাহ্যিক প্রচারের চেয়ে অন্তরের শুদ্ধতার মধ্য দিয়ে চর্চা করেন এবং তাঁর সুগভীর মানবতাবাদী ভাবাদর্শকে দৈনন্দিন জীবনে ধারণ করেন। সত্য অন্বেষণ ও আত্ম-অনুসন্ধানে মানুষের আগ্রহ দিন দিন বহুগুণ বৃদ্ধি পাচ্ছে বলেই আখড়াবাড়িতে জ্ঞান পিপাসু মানুষের ঢল নেমেছে।
লালনের অসাম্প্রদায়িক দর্শন মেনে সমাজের প্রতিটি স্তরে মানবপ্রেম জাগ্রত করার আকুল আহ্বান জানান এই প্রবীণ বাউল সাধক। তিনি গুরুত্বারোপ করে বলেন যে, লালন সাঁইজির দর্শন হলো ভেতরের ও আত্মিক উন্নতির দর্শন। ব্যক্তিস্বার্থ ও জাতিগত বিভেদ ভুলে মানুষের ভেতরে যদি প্রকৃত শুভচেতনার বীজ বপন করা যায়, তবে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবন সুন্দর হয়ে উঠবে। অন্তরের এই বিশুদ্ধ ভালোবাসা ও ব্যাকুলতাই লালনের সত্যকে জানার মূল চাবিকাঠি।