দীর্ঘ তিন দশক পর ধামরাইয়ের রুপনগরের বেদে পল্লী পরিদর্শন করলেন ঢাকা জেলার ডিসি ফরিদা খানম। বাসিন্দাদের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি তাদের জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ সহায়তা ও প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে।
দীর্ঘ তিন দশক অর্থাৎ প্রায় ৩০ বছর পর ধামরাই উপজেলার কুল্লা ইউনিয়নের রুপনগরে অবস্থিত বেদে পল্লীতে পা রাখলেন কোনো জেলা প্রশাসক। এতদিন অবহেলিত এই জনপদের মানুষের খোঁজখবর নেওয়ার কেউ সেভাবে না থাকলেও এবার সেই চিত্র বদলে গেছে। ঢাকা জেলার জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম সম্প্রতি স্বয়ং উপস্থিত হয়ে এই বেদে পল্লীর বাসিন্দাদের দীর্ঘদিনের সুখ-দুঃখের কথা শুনেছেন এবং তাদের নানান সমস্যার সমাধান ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার ধামরাই উপজেলার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মসূচির অংশ হিসেবে হঠাৎ করেই রুপনগরের বেদে পল্লীতে উপস্থিত হন জেলা প্রশাসক। তার এই আকস্মিক ও মানবিক উপস্থিতিতে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। দীর্ঘ ৩০ বছর পর প্রশাসনের শীর্ষ কোনো কর্মকর্তাকে নিজেদের মাঝে পেয়ে তারা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা, নানা সামাজিক সমস্যা এবং আশু প্রয়োজনের কথা অকপটে তুলে ধরেন। ডিসি মহোদয় অত্যন্ত মনোযোগ সহকারে তাদের কথা শোনেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন সহায়তার আশ্বাস প্রদান করেন।
এদিন জেলা প্রশাসকের উপস্থিতিতে পল্লীর মোট ৬৩টি পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয় জরুরি শুকনা খাবার। এছাড়া এলাকার ১২টি পরিবারকে ঘর নির্মাণের জন্য ঢেউটিন এবং প্রত্যেককে ছয় হাজার টাকা করে মোট বাহাত্তর হাজার টাকার নগদ আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। শুধু বড়দের জন্যই নয়, পল্লীর ১১৩ জন নারী ও পুরুষকে নতুন শাড়ি ও থ্রিপিস দেওয়া হয় এবং আনন্দ ছড়িয়ে দিতে দুই শতাধিক শিশুর হাতে তুলে দেওয়া হয় নানা ধরনের খেলনা।
প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই অঞ্চলে বেদে সম্প্রদায়ের মানুষ বসবাস করে আসলেও তাদের জীবনমান পরিবর্তন বা তাদের বাস্তব সমস্যাগুলো সরাসরি দেখার সুযোগ এর আগে প্রশাসনের তেমন একটা হয়নি। তবে মিজ ফরিদা খানম সেখানে পৌঁছেই বেদে জনগোষ্ঠীর জীবনমান চিরতরে পাল্টে দিতে বেশ কিছু যুগান্তকারী উদ্যোগের ঘোষণা দেন। তিনি জানান, উপজেলা পরিষদের পক্ষ থেকে এই বেদে পল্লীর সার্বিক উন্নয়নে পাঁচ লাখ টাকার একটি বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের স্থায়ী বসবাসের জন্য খাসজমি বরাদ্দ এবং কর্মসংস্থানের জন্য ২৫টি সেলাই মেশিন বিতরণের ঘোষণা দেন তিনি।
এ সময় জেলা প্রশাসক মিজ ফরিদা খানম অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের কোনো নাগরিক বা সমাজের কোনো পিছিয়ে পড়া মানুষ যেন সরকারি উন্নয়ন ও সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেই লক্ষ্যেই বর্তমান প্রশাসন নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বেদে জনগোষ্ঠীর মতো প্রান্তিক ও অবহেলিত মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করতে এবং তাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
উল্লেখ্য, ধামরাই উপজেলার সামগ্রিক সফরকালে জেলা প্রশাসক কেবল বেদে পল্লীতেই সীমাবদ্ধ থাকেননি, বরং তিনি উপজেলার বিভিন্ন শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মসূচিতেও সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্দেশ্যে তিনি উপজেলার ৫২টি মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় করেন এবং পরীক্ষায় অসাধারণ ফলাফল অর্জনকারী ১৮৬ জন কৃতি শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা জানান। এছাড়া প্রাথমিক স্তরের ৪২ জন শিক্ষার্থীর মাঝে স্কুল ড্রেস, ব্যাগ ও জুতো বিতরণ করা হয়।
সামাজিক কল্যাণমূলক কাজের অংশ হিসেবে উদ্যোক্তা ও আত্মকর্মসংস্থান প্রত্যাশীদের মাঝে ঋণ বিতরণ করা হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্পোর্টস ক্লাবের হাতে তুলে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় ক্রীড়া সামগ্রী, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিশেষ স্কুল এবং তিনটি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে শিক্ষা উপকরণ এবং অসহায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মাঝে হুইলচেয়ার বিতরণ করা হয়। এমনকি প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ‘হ্যালো ডিসি’ অ্যাপের মাধ্যমে আবেদন করা ১৫ জন দুস্থ ও অসহায় ব্যক্তির হাতে আর্থিক সহায়তার চেক তুলে দেওয়া হয়। জননিরাপত্তা ও পরিবেশ সুরক্ষার অংশ হিসেবে গ্রাম পুলিশদের মাঝে পোশাক ও সরঞ্জাম এবং আব্দুস সোবহান মডেল স্কুলের সাতশ শিক্ষার্থীর হাতে গাছের চারা বিতরণের মধ্য দিয়ে এই মহতী কর্মসূচি শেষ হয়।