|
দ্রুত লিংক
বিভাগসমূহ
মিডিয়া বিভাগ
নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ : Jul 21, 2026 ইং
অনলাইন সংস্করণ

গ্লাসগোর দেয়াল, নদী আর স্টেডিয়ামের মাঝে কমনওয়েলথ গেমসের নতুন ইতিহাস

স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো শহরটি কেবল কিছু রাস্তা, অট্টালিকা কিংবা স্টেডিয়ামের গাণিতিক সমন্বয়ে গড়ে ওঠেনি, এর পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে শত বছরের সমৃদ্ধ গল্প ও ঐতিহ্য। এই শহরের পুরোনো কোনো ভবনের ইটের দেয়ালে লুকিয়ে আছে সুদীর্ঘ অতীত, কোনো নদীর প্রবহমান স্রোত বয়ে আনে প্রাচীন সভ্যতার অম্লান স্মৃতি, আবার কোনো সরু গলির ভেতর কান পাতলে শোনা যায় সাধারণ মানুষের জীবনসংগ্রাম ও আকাশছোঁয়া স্বপ্নের প্রতিধ্বনি। ২০২৬ কমনওয়েলথ গেমসের ক্ষণগণনা যখন শুরু হয়েছে, তখন সারা বিশ্বের ক্রীড়াপ্রেমীদের নজর গিয়ে ঠেকেছে এই শহরের নির্দিষ্ট কিছু ভেন্যুর দিকে। একসময়ে বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম শিল্পকেন্দ্র ও জাহাজ নির্মাণের রাজধানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করা গ্লাসগো সময়ের নির্মম ও সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনে আজ শিল্প, সংস্কৃতি, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিশ্বক্রীড়ার এক আধুনিক মিলনকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।

গ্লাসগোর নাড়ির স্পন্দনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক ক্লাইড নদী। অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতাব্দীতে মূলত এই নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও কর্মমুখর জাহাজ নির্মাণ শিল্প। ক্লাইডের পাড়ে তৈরি সুবিশাল সব জাহাজ একসময় সাত সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছে যেত পৃথিবীর নানা প্রান্তে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নত প্রকৌশলবিদ্যা এবং স্থানীয় শ্রমিকদের অসাধারণ দক্ষতার বলে গ্লাসগো একসময় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অর্থনীতির অন্যতম শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছিল। সেযুগে শিপইয়ার্ডের ভারী যন্ত্রপাতি আর হাতুড়ির শব্দে মুখর থাকা ক্লাইড নদীর তীর কেবল ভারী শিল্পের কেন্দ্রই ছিল না, বরং তা শ্রমিক আন্দোলন, অধিকার আদায়ের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক অনন্য ইতিহাসেরও সাক্ষী। সময়ের গড়ায় শিল্পের বহু কারখানা বন্ধ হয়ে গেলেও গ্লাসগো থেমে থাকেনি; বরং পুরোনো শিল্পভিত্তিক কাঠামোর ওপর ভর দিয়েই মাথা তুলেছে এক আধুনিক গ্লাসগো, যেখানে বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, সংগীতের আসর, থিয়েটার, সৃজনশীল শিল্প এবং পর্যটন খাত আজ শহরের নতুন অর্থনৈতিক শক্তির উৎস।

শহরের সাংস্কৃতিক প্রাণস্পন্দন অনুভব করতে হলে পা রাখতে হবে কেলভিনগ্রোভ আর্ট গ্যালারি, বিখ্যাত জাদুঘর, ছোট ছোট নান্দনিক ক্যাফে, স্থানীয় প্রাণোচ্ছল বাজার কিংবা নজরকাড়া স্ট্রিট আর্টে। গ্লাসগোর দেওয়ালগুলোও যেন রূপকথার মতো আজ মুখর হয়ে উঠেছে। শহরের বিভিন্ন প্রান্তের দেওয়ালের গায়ে আঁকা দৃষ্টিনন্দন মুরালে অমর করে রাখা হয়েছে ডানকান স্কট, জশ কের ও আইলিশ ম্যাককলগানের মতো স্কটিশ ক্রীড়াবিদদের প্রতিকৃতি। এগুলো নিছক কোনো সাধারণ ছবি নয়, বরং নিজেদের ঘরের কৃতি সন্তানদের প্রতি গোটা শহরের গভীর ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার এক দারুণ প্রকাশ। কমনওয়েলথ গেমসের জলের লড়াইয়ের প্রধান আবেগ জমা হবে টলক্রস ইন্টারন্যাশনাল সুইমিং সেন্টারে। স্কটিশ সাঁতারের আবেগের ঠিকানা এই পুলটিতেই ২০১৪ সালের গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে ১৭ বছর বয়সি কিশোর ডানকান স্কট প্রথম বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিলেন। যে তরুণ আজ অলিম্পিক পদকজয়ী জীবন্ত কিংবদন্তিতে পরিণত হয়েছেন, তাঁকে সম্মান জানাতে টলক্রসের একটি স্ট্যান্ডের নামকরণ করা হয়েছে ‘দ্য স্কট স্ট্যান্ড’। যেখানে তাঁর স্বপ্নের সার্থক রূপায়ন শুরু হয়েছিল, সেই প্রাঙ্গণটি আজ তাঁর অসামান্য সাফল্যের জীবন্ত স্মারক।

জলের নীল জগতের পাশাপাশি টলক্রসের চারপাশের দৈনন্দিন জনজীবনও গেমসের উত্তাপে নতুন রূপ নেবে। স্থানীয় সাধারণ বাসিন্দাদের সঙ্গে তখন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মিশে যাবেন বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ছুটে আসা অ্যাথলেট, কোচ ও হাজারো দর্শক। একই শহরের রাজপথে পাশাপাশি হাঁটবেন কোনো অলিম্পিক চ্যাম্পিয়ন এবং সাধারণ পথচারী। অন্যদিকে অ্যাথলেটিকস ও ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডের সব রোমাঞ্চের কেন্দ্রবিন্দু হবে স্কটসটাউন স্টেডিয়াম। আধুনিক ট্র্যাক, স্টেডিয়ামের কাছাকাছি বসে বিশ্বমানের অ্যাথলেটদের পারফরম্যান্স উপভোগ করার সুযোগ এবং গ্যালারির গর্জন এই ভেন্যুকে করে তুলেছে টুর্নামেন্টের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থান। এখানেই দেশের জার্সিতে ট্র্যাক কাঁপাবেন বিশ্বরেকর্ডধারী জশ কের, আইলিশ ম্যাককলগান ও লরা মুইরের মতো তারকা অ্যাথলেটরা। নিজেদের জন্মশহরে ঘরের দর্শকদের সামনে প্রিয় তারকাদের সরাসরি খেলতে দেখার সুযোগ এই স্টেডিয়ামকে এক আবেগময় মঞ্চে রূপ দেবে।

স্যার ক্রিস হয় ভেলোড্রোম ও এরিনা হবে ট্র্যাক সাইক্লিং, প্যারা ট্র্যাক সাইক্লিং এবং শৈল্পিক জিমন্যাস্টিকসের জমজমাট লড়াইয়ের ক্ষেত্র। আর বহুমুখী ক্রীড়াযজ্ঞের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে বিশাল স্কটিশ ইভেন্ট ক্যাম্পাস বা এসইসি। এই চত্বরের ওভিও হাইড্রো অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে আকর্ষণীয় নেটবল ম্যাচ ও জমকালো গ্লাসগো গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান। এসইসি সেন্টারের ফ্লোরে চলবে বক্সিং, লন বোলস, প্যারা বোলস, জুডো, তিন-জনের বাস্কেটবল ও হুইলচেয়ার তিন-জনের বাস্কেটবলের মতো ইভেন্টগুলো। এছাড়া এসইসি আর্মাডিলো মঞ্চে লড়বেন ভারোত্তোলন ও প্যারা পাওয়ারলিফটিংয়ের পরাশক্তিরা। গ্লাসগোর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মুকুটে আরেকটি বড় রত্ন হলো এই রিভার ক্লাইড। এককালের শিল্প ও বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র এই নদী আজ শহরটির পুনর্জাগরণ ও পরিবেশগত সৌন্দর্যের প্রতীক। নদীর দুই পাড়ে গড়ে ওঠা আধুনিক স্থাপত্য, ঐতিহাসিক স্থাপত্যশৈলী এবং মানুষের নিরবচ্ছিন্ন ব্যস্ততা মিলে তৈরি করেছে এক অপরূপ শহুরে পরিবেশ।

শহরের ঐতিহাসিক জর্জ স্কয়ারে পা রাখলেই অনুভব করা যায় গ্লাসগো কত সুদীর্ঘ ও গভীর ইতিহাস বহন করে চলেছে। রাজনৈতিক অধিকারের আন্দোলন, আমূল সামাজিক পরিবর্তন এবং মানুষের মৌলিক অধিকার আদায়ের বহু ঐতিহাসিক ঘটনার নীরব সাক্ষী এই চত্বরটি। গ্লাসগোর সাধারণ মানুষ কেবল একনিষ্ঠ ক্রীড়াপ্রেমীই নন, তাঁরা নিজেদের সোনালী ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে দারুণভাবে গর্বিত। বিমানবন্দর থেকে শুরু করে শহরের কেন্দ্রস্থল, অলিগলির ক্যাফে থেকে নদীর পার কিংবা কোলাহলপূর্ণ স্থানীয় বাজার সব মিলিয়ে গোটা গ্লাসগোজুড়েই এখন বইছে উৎসবের উষ্ণ হাওয়া। মাত্র চারটি প্রধান ভেন্যু হলেও এর পেছনে লুকিয়ে আছে হাজারো মানুষের জয়-পরাজয়ের না বলা গল্প। কোথাও পানির তীব্র গতি, কোথাও অ্যাথলেটিক ট্র্যাকের ঝড়ো দৌড়, কোথাও শক্তির চরম পরীক্ষা, আবার কোথাও নিখুঁত দক্ষতার কঠিন লড়াই সব গল্পের মূল কেন্দ্রে রয়েছেন গ্লাসগোর প্রাণবন্ত মানুষগুলো।

২০১৪ সালের সফল আয়োজনের পর গ্লাসগো আরেকবার পুরো ক্রীড়াযজ্ঞকে সাধারণ মানুষের এক বিশাল উৎসবে রূপ দেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে। হাতে সময় কম থাকায় প্রস্তুতির চ্যালেঞ্জ কিছুটা বড়, তবে গ্লাসগোর সবচেয়ে বড় ও অটুট শক্তি হলো এর সাহসী ও সচেতন নাগরিক সমাজ। আগামী ২৩ জুলাই যখন ৭৪টি দেশের রঙিন পতাকা এই শহরের আকাশে পতপত করে উড়বে, তখন শুধু নির্দিষ্ট চারটি ভেন্যু নয়, বরং গোটা গ্লাসগো শহরটিই পরিণত হবে একটি বিশাল জীবন্ত স্টেডিয়ামে। শহরের প্রতিটি অলিগলিতে থাকবে নতুন গল্প, প্রতিটি প্রাচীর কথা বলবে স্মৃতির ভাষায়, আর প্রতিটি মানুষের চোখে-মুখে ঝলকাবে অকৃত্রিম গর্ব। শিল্প কারখানার এই ঐতিহাসিক শহর, নদীর এই শান্ত জনপদ, সংগ্রামের এই সুদৃঢ় ভূমি এবং সংস্কৃতির এই পবিত্র পীঠস্থান আজ প্রস্তুত কমনওয়েলথের নতুন ইতিহাস বুকে ধারণ করতে। গ্লাসগোর প্রাচীন দেওয়ালগুলো কথা বলে, খরস্রোতা নদী গল্প শোনায়, আর স্টেডিয়ামগুলো অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে নতুন কোনো রূপকথা লেখার জন্য।

মন্তব্য করুন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়

নারায়ণগঞ্জের যেসব এলাকায় রোববার ২৪ ঘণ্টা গ্যাস থাকবে না

1

সুইজারল্যান্ড ছাড়ল ইরানি প্রতিনিধি দল

2

রামেক হাসপাতালে ২৮ কোটি টাকার বিদেশি ওষুধ

3

সাপ মারতে জাপানে নেওয়া হয়েছিল বাংলাদেশি বেজি, শেষ পর্যন্ত ঘট

4

২২ ক্যারেট স্বর্ণের ভরি কত, কমল দাম

5

শঙ্কা জাগিয়ে অ্যাম্বুলেন্সে মাঠ ছাড়লেন ইন্টার মায়ামি ফরোয়ার্

6

অভিনেত্রী মেহের আফরোজ শাওনকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার দাবি জানাল

7

দিল্লি পুলিশকে এড়িয়ে সংসদ ভবনের কাছে ককরোচ পার্টির বিক্ষোভকা

8

অক্টোবরের নির্বাচনে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু

9

কাশ্মীরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষে পুলিশসহ নিহত ১১

10

এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের চূড়ায় বিয়ের প্রস্তাব: রুশ যুগলকে

11

শ্রীলঙ্কাকে হারিয়েও বিদায় নিল পাকিস্তান: ৫ রানের নাটকীয় জয়ে

12

বাংলাদেশিদের জন্য ভারতীয় ভিসা চালু ২০২৬ | হুমায়ুন কবিরের সুখ

13

সমালোচকদের ‘আবর্জনা’ বললেন হুগো ব্রুস

14

জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় গবেষণা ও উদ্ভাবনে অগ্রাধিকার দেওয়া

15

শিশুদের সুস্বাস্থ্যে মায়ের দুধের বিকল্প নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্র

16

১৮টি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন-মিসাইল হামলা

17

হরমুজ প্রণালিতে সমঝোতার আশা জাগলেও পারমাণবিক চুক্তির ভবিষ্যৎ

18

বাগেরহাটে ২২ কেজির বিরল ‘দাতিনা ভোল’ মাছ সাড়ে ৩ লাখে বিক্রি

19

জিম্বাবয়ে সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে অভিষেক শর্মার ওপেনিং

20