যুক্তরাজ্যের ব্রিস্টল শহরে গড়ে উঠছে নতুন সুউচ্চ স্থাপনা ‘সেন্ট জেমস হাউস’। ২৮ তলা বিশিষ্ট এই শিক্ষার্থী আবাসন প্রকল্প এবং তরুণ পেশাজীবীদের জন্য ১৮ তলার কো-লিভিং ব্লক শহরের আকাশরেখায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। তবে দৃশ্যমান এই আধুনিক স্থাপত্যের আড়ালে জড়িয়ে রয়েছে বিশ্বব্যাপী পুঁজিপ্রবাহ, ইসরাইলি সামরিক খাতে বিনিয়োগ এবং ব্রিটিশ রাজনীতির সঙ্গে গভীর সম্পৃক্ততার এক জটিল সমীকরণ।
এই প্রকল্পটির পেছনে যৌথ অর্থায়নকারী হিসেবে রয়েছে রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেইন ইন্টারন্যাশনাল’ এবং ইসরাইলের অন্যতম বৃহৎ বীমা ও আর্থিক সেবা গোষ্ঠী ‘মেনোরা মিভতাচিম’। যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থীদের আবাসন ব্যবসার রমরমা অবস্থার সুযোগ নিয়ে এসব প্রতিষ্ঠান লিভারপুল, ম্যানচেস্টার ও লিডসের মতো শহরগুলোতেও বড় বড় প্রকল্প পরিচালনা করছে। বিশেষ করে সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ার পর ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যখন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে, তখন এই ধরনের আধুনিক ছাত্রাবাসগুলো বিনিয়োগকারীদের কাছে একটি অত্যন্ত লাভজনক ও স্থিতিশীল খাতে পরিণত হয়েছে।
এই বিনিয়োগের বিষয়টি আরও বেশি বিতর্কিত হয়ে উঠেছে কারণ ‘মেনোরা মিভতাচিম’ ইসরাইলের সামরিক অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের জন্য পরিচিত। গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘হু প্রফিটস’-এর তথ্যানুযায়ী, নেগেভ মরুভূমিতে ইসরাইলি সামরিক বাহিনীর বিশাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং গোয়েন্দা ইউনিটগুলোর ক্যাম্পাস নির্মাণে এই প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা রয়েছে। এছাড়া পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনকারী নির্মাণ কোম্পানি ‘শিকুন অ্যান্ড বিনুই’ এবং বিভিন্ন নিরাপত্তা ও নজরদারি প্রযুক্তিতেও তাদের বড় ধরনের শেয়ার রয়েছে।
প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত ‘কেইন’-এর সিইও জোনাথন গোল্ডস্টেইন নিজেও ব্রিটিশ রাজনীতিতে বেশ প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব। তিনি লেবার পার্টির প্রাক্তন নেতা জেরেমি করবিনের বিরুদ্ধে প্রচারণায় নেতৃত্ব দেওয়া থেকে শুরু করে বর্তমান সরকারের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য আলোচিত। ইসরাইলের প্রতি তার প্রকাশ্য সমর্থন এবং গাজায় সামরিক অভিযানের পক্ষে তার অবস্থান ব্রিস্টলের সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ব্রিস্টল শহরটি একদিকে তার বাণিজ্যিক পুঁজিবাদের ইতিহাসের জন্য পরিচিত, অন্যদিকে এটি ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনেরও অন্যতম প্রাণকেন্দ্র। একদিকে শহরের কেন্দ্রস্থলে গৃহহীন মানুষের তাঁবুর সারি আর অন্যদিকে ইসরাইলি পুঁজি ও সামরিকায়নের সঙ্গে যুক্ত বহুতল ভবনের চকচকে রূপ ব্রিস্টলের এই বৈপরীত্য আজ চরম আকার ধারণ করেছে। ২০২৮-২৯ শিক্ষাবর্ষে চালু হতে যাওয়া সেন্ট জেমস হাউস কেবল একটি আবাসন প্রকল্প নয়, এটি এমন এক আর্থিক ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকবে, যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে দখলদারিত্ব ও গণহত্যার বিতর্কিত ইতিহাস।
মন্তব্য করুন