মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাকে এক মর্মান্তিক ও ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ২১ জন যাত্রী আগুনে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছেন। গত রোববার (৭ জুন) দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় নাসিরিয়া (Nasiriya) শহরের কাছে একটি যাত্রীবাহী দূরপাল্লার বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যাওয়ার পর এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। এই বুকফাটা দুর্ঘটনায় আরও অন্তত ১৯ জন যাত্রী গুরুতরভাবে দগ্ধ ও আহত হয়েছেন বলে দেশটির পুলিশ ও স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা আজ আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
স্থানীয় ট্রাফিক প্রশাসন ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স (Reuters) জানায়, নাসিরিয়ার নিকটবর্তী একটি ব্যস্ত মহাসড়কে দ্রুতগতির বাসটির চালক হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারালে গাড়িটি সড়ক বিভাজকের সাথে ধাক্কা খেয়ে উল্টে যায়। উল্টে যাওয়ার সাথে সাথেই ফুয়েল ট্যাংকার বিস্ফোরণে মুহূর্তের মধ্যে পুরো বাসে দাউ দাউ করে আগুন ধরে যায়। ফলে ভেতরে থাকা যাত্রীদের অধিকাংশেরই বের হওয়ার সুযোগ ছিল না। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও উদ্ধারকর্মীরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন এবং হতাহতদের উদ্ধার করেন।
নাসিরিয়ার চিকিৎসা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভয়াবহ এই অগ্নিকাণ্ডে ঘটনাস্থলে এবং হাসপাতালে নেওয়ার পর মোট ২১ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। এছাড়া চিকিৎসাধীন আহত ১৯ জনের অধিকাংশেরই শরীর মারাত্মকভাবে (শতকরা ৮০ ভাগের বেশি) পুড়ে গেছে এবং বর্তমানে তাদের অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। ফলে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে হাসপাতালের জরুরি বিভাগ থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
এই ভয়াবহ ও হৃদয়বিদারক সড়ক দুর্ঘটনার পর ইরাকের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি গভীর শোক প্রকাশ করেছেন। নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে দেওয়া এক বিশেষ বিবৃতিতে জানানো হয়েছে—তিনি এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে একটি উচ্চপর্যায়ের বিচারবিভাগীয় তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। ঠিক কী পরিস্থিতিতে, কার গাফিলতিতে এই অকাল প্রাণহানি ঘটল—তা খতিয়ে দেখে দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে সংশ্লিষ্ট ক্রাইম সিন ও ট্রাফিক কর্তৃপক্ষকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ইরাকে সড়ক দুর্ঘটনার মূল কারণসমূহ (বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ):
১. বেপরোয়া গতি: মহাসড়কে চালকদের অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চালানোর অনীহা।
২. বেহাল সড়ক: বছরের পর বছর যুদ্ধবিদ্ধস্ত রাস্তার সংস্কার না হওয়া।
৩. দুর্বল আইন: ট্রাফিক আইনের আধুনিক ও যথাযথ প্রয়োগের অভাব।
আন্তর্জাতিক পরিবহন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তেলসমৃদ্ধ দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইরাকে প্রতিনিয়ত এই ধরনের ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা সাধারণ ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মূলত অতিরিক্ত গতিতে অনভিজ্ঞ চালক দ্বারা গাড়ি চালানো, মহাসড়কগুলোর বেহাল দশা এবং ট্রাফিক আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও আধুনিক নজরদারি না থাকার কারণে দেশটিতে প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় বিপুল সংখ্যক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ওয়ান স্টপ ট্রাফিক ব্যবস্থার সংস্কার না হলে এই মৃত্যুমিছিল থামানো সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।
মন্তব্য করুন