কলকাতার গিরিশ পার্ক এলাকায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড়ের চাপে পদদলিত হয়ে ১৩ জন নারীসহ ১৯ জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আটক করা হয়েছে ১২ জনকে।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতার একটি জনপ্রিয় দুর্গাপূজার মণ্ডপে অতিরিক্ত ভিড় ও অব্যবস্থাপনার কারণে ঘটা মর্মান্তিক পদদলিত হওয়ার ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েই চলেছে। উত্তর কলকাতার গিরিশ পার্ক থানা এলাকার সারদা পার্ক (চোরবাগান) সার্বজনীন দুর্গোৎসব মণ্ডপে সংঘটিত এই দুর্ঘটনায় সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী নিহত বেড়ে ১৯ জনে দাঁড়িয়েছে। মর্মান্তিক এই মৃতদের তালিকায় ১৩ জন নারী ও একটি শিশু রয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়া এই ঘটনায় গুরুতর আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৫ জন, যাদের মধ্যে আটজনের শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় উত্তর কলকাতার ব্যস্ত এই পূজামণ্ডপে মারাত্মক এই দুর্ঘটনাটি ঘটে। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, সেদিন সন্ধ্যায় বৃষ্টি উপেক্ষা করেই বিপুলসংখ্যক পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থী প্রতিমা দর্শনের জন্য সারদা পার্কের মণ্ডপে হুমড়ি খেয়ে পড়েন। অতিরিক্ত মানুষের চাপে প্রবেশ ও প্রস্থান পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিটের দিকে এই পদদলিত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। খবর পেয়ে পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, রাজ্য দুর্যোগ মোকাবিলা দল এবং জরুরি চিকিৎসক দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধারকাজ শুরু করে এবং আহতদের দ্রুত উদ্ধার করে নিকটস্থ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনার পর থেকেই দর্শনার্থীদের জন্য মণ্ডপটি পুরোপুরি বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এই ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে পূজা কমিটির আয়োজকসহ মোট ১২ জনকে আটক করেছে কলকাতা পুলিশ।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল দ্রুত হাসপাতালে ছুটে যান এবং চিকিৎসাধীন আহতদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। গণমাধ্যমের সাথে আলাপকালে মুখ্যমন্ত্রী জানান, মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ভিড় সুশৃঙ্খলভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে সিসিটিভি ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হবে। যদি পূজা কমিটি, পুলিশ প্রশাসন কিংবা বেসরকারি নিরাপত্তা রক্ষীদের কোনো ধরনের গাফিলতি বা অবহেলা প্রমাণিত হয়, তবে কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন তিনি। পাশাপাশি রাজ্যের সকল বড় দুর্গাপূজার মণ্ডপের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোরভাবে পর্যালোচনা করতে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে বড় আর্থিক ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। দুর্ঘটনায় নিহত প্রত্যেকের পরিবারকে ২৫ লাখ রুপি করে আর্থিক সহায়তা এবং পরিবারের অন্তত একজনের জন্য ‘গ্রুপ ডি’ পদে সরকারি চাকরি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, অতিরিক্ত ভিড়ের মাঝে মানুষ যখন পদদলিত হতে শুরু করে, তখন অনেকে জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। মণ্ডপের যাতায়াতের রাস্তা, প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ অত্যন্ত সরু হওয়া এবং পর্যাপ্ত আলোর ব্যবস্থা না থাকাকেও এই ভয়াবহ দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে দায়ী করেছেন স্থানীয়রা। এদিকে পূজার আয়োজকদের একজন বিকাশ দাস দাবি করেছেন, ঠিক কী পরিস্থিতিতে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছিল তা তদন্ত সাপেক্ষে পরিষ্কার হবে, তবে তাঁদের মূল অগ্রাধিকার ছিল আহতদের দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া।