ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তীব্র যুদ্ধাবস্থা চললেও ইরানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের চাকা থেমে নেই, বরং তা আরও বেগবান হয়েছে। পশ্চিমা এশিয়ার এই দেশটি বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার আয় করছে, যার পুরোটাই আসছে তেল রপ্তানি থেকে। আন্তর্জাতিক বাজার পর্যবেক্ষক সংস্থা ও গোয়েন্দা তথ্যের বরাতে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, যুদ্ধের সংকটের মধ্যেও ইরানের জ্বালানি বাণিজ্য সচল রয়েছে এবং দেশটি অত্যন্ত কৌশলে এই পরিস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষ দিকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ জোরালো করেছে। বিশ্বের মোট জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই পথ দিয়েই সম্পন্ন হয়। হরমুজ প্রণালিতে কড়াকড়ি আরোপের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো যখন তাদের রপ্তানি নিয়ে বিপাকে পড়েছে এবং তেলের উত্তোলন কমিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছে, ইরান ঠিক তখনই নিজের ‘ইরানিয়ান লাইট’ তেল অবাধে বিশ্ববাজারে পাঠাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন দেশটি গড়ে ১০ লাখ ৬০ হাজার ব্যারেল তেল রপ্তানি করছে বলে জানা গেছে।
মজার বিষয় হলো, যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় ইরানের আয়ের পরিমাণ আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সমপরিমাণ তেল বিক্রি করে ইরান দৈনিক যেখানে ১১ কোটি ৫০ লাখ ডলার আয় করত, এখন তা বেড়ে প্রায় ১৪ কোটি ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে। অর্থাৎ যুদ্ধের ডামাডোলে তেলের উচ্চমূল্য ইরানের জন্য বাড়তি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দিয়েছে। এছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলো থেকেও দেশটি প্রতিদিন প্রায় ২০ লাখ ডলার টোল আদায় করছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইরানের তেল খাতকে চাপে ফেলার যে লক্ষ্য ছিল, তা আপাতত সফল হচ্ছে না। উল্টো ট্রাম্প প্রশাসনের নীতি ও যুদ্ধের ডামাডোল দেশটিকে বড় অংকের মুনাফা অর্জনের নতুন সুযোগ করে দিয়েছে। ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে তেল প্রথমে খার্গ দ্বীপের টার্মিনালে নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক রুট দিয়ে তা বিভিন্ন দেশে পৌঁছে যাচ্ছে। যুদ্ধের মধ্যেও ইরানের তেল উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত না হওয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতি ইরানের অর্থনীতিতে এক অদ্ভুত গতি এনে দিয়েছে। একদিকে সামরিক উত্তেজনা বাড়লেও অন্যদিকে দেশটির তেলের বাজার আরও চাঙ্গা হয়েছে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সংকটের এই সময়ে ইরান যেভাবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে এবং রেকর্ড পরিমাণ আয় করছে, তা ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে দেশটিকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মন্তব্য করুন