২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলের রোমাঞ্চকর ও হাইভোল্টেজ ফাইনালে লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে অতিরিক্ত সময়ের লড়াইয়ে ১-০ গোলে পরাজিত করে নিজেদের ইতিহাসের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ ট্রফি নিজেদের করে নিয়েছে স্পেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হাত থেকে চ্যাম্পিয়ন ট্রফি গ্রহণ করে স্প্যানিশ দল। স্পেনের এই গৌরবময় বিশ্বজয়ের পর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধবিধ্বস্ত ভূখণ্ড ফিলিস্তিনজুড়ে আনন্দের এক বিশাল বন্যা বয়ে গেছে। অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকায় এই জয় কেবল নিছক কোনো ক্রীড়া সাফল্য হিসেবে নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণের পক্ষে স্পেনের ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কূটনৈতিক সমর্থনের প্রতি এক অনন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রতীক হয়ে উঠেছে।
ইসরাইলি আগ্রাসনে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত গাজায় স্থায়ী বিদ্যুৎ সংযোগ না থাকায় তাঁবু বা ধ্বংসস্তূপের মাঝে ব্যক্তিগতভাবে ম্যাচ উপভোগ করা অসম্ভব ছিল। তবুও গাজার বিভিন্ন জনবহুল এলাকায় বড় পর্দার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে শত শত ফিলিস্তিনি তরুণ ও সাধারণ মানুষ ক্যাফে ও খোলা আকাশের নিচে জড়ো হয়ে ঐতিহাসিক এই ফাইনাল উপভোগ করেন। রেফারির শেষ বাঁশি বাজার সাথে সাথেই সেই জমায়েত এক স্বতঃস্ফূর্ত ও আবেগঘন উদযাপনে রূপ নেয়।
ফিলিস্তিনি তরুণ ও শিশুরা এ সময় স্পেনের জাতীয় পতাকা হাতে রাস্তায় নেমে উল্লাস প্রকাশ করে এবং করতালির মাধ্যমে বিজয়ী স্প্যানিশ দলকে উষ্ণ অভিনন্দন জানায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া বিভিন্ন ভিডিওচিত্রে দেখা গেছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলা নির্মম ইসরাইলি হামলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া গাজার শিশুরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দের এই দুর্লভ মুহূর্তটি উদযাপন করছে। ওমানের বিশিষ্ট সমাজকর্মী শাবান আহমেদ আল-আজিলিসহ আন্তর্জাতিক অঙ্গনের অনেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন যে, গাজা তার বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ানো বন্ধুদের কখনো ভুলে যায় না; আর এই জয় ধ্বংসস্তূপ ও দীর্ঘ গণহত্যার বেদনার ভেতর থেকেই উঠে আসা একটি খাঁটি কৃতজ্ঞতার বহিঃপ্রকাশ।
ফুটবল মাঠের এই ঐতিহাসিক জয় ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মহলেও দারুণ প্রাণচাঞ্চল্য তৈরি করেছে। ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ এবং প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজকে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক অভিনন্দন বার্তায় স্পেনের এই অর্জনকে একটি ‘মহৎ বৈশ্বিক ক্রীড়া অর্জন’ বলে অভিহিত করেছেন। এ ছাড়া স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের রাজনৈতিক ব্যুরোর পক্ষ থেকে কর্মকর্তা বাসেম নাঈম স্পেনের এই যোগ্য ও ঐতিহাসিক বিজয়কে স্বাগত জানিয়ে ফিলিস্তিন ও এর বিশ্বস্ত সমর্থকদের আন্তরিক অভিনন্দন জানিয়েছেন। অধিকৃত পশ্চিম তীরের বেথলেহেম, হেব্রন ও নাবলুসের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতেও শত শত ফিলিস্তিনি স্প্যানিশ ও ফিলিস্তিনি পতাকা হাতে নিয়ে রাজপথে বর্ণাঢ্য বিজয় মিছিল করেছেন। প্রখ্যাত ফিলিস্তিনি কার্টুনিস্ট আলা আল-লাকতা এবং মোহাম্মদ সাবানেহ তাদের নিজস্ব শিল্পকর্মে তরুণ তারকা লামিন ইয়ামালসহ স্প্যানিশ খেলোয়াড়দের হাতে ফিলিস্তিনের পতাকা তুলে ধরে দুই দেশের পারস্পরিক দৃঢ় সংহতি অত্যন্ত চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। উল্লেখ্য, এর আগে বার্সেলোনার ঐতিহাসিক লা লিগা জয়ের উদযাপনের সময়ও ফিলিস্তিনের পতাকা উঁচিয়ে ধরেছিলেন উদীয়মান তারকা লামিন ইয়ামাল।
ফিলিস্তিনিদের এই বাঁধভাঙা উল্লাসের মূল রাজনৈতিক কারণ হলো ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে স্পেনের অত্যন্ত সাহসী ও জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান। ২০২৪ সালের মে মাসে ইউরোপের অন্যতম প্রভাবশালী দেশ হিসেবে স্পেন আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়, যা ইসরাইলকে তীব্রভাবে ক্ষুব্ধ করেছিল। এরপর ২০২৫ সালে ইসরাইলের ওপর কঠোর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ফিলিস্তিনি ভূমিতে অবৈধ বসতি স্থাপনের ওপর কঠোর কড়াকড়ি এবং তেল আবিব থেকে নিজেদের রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেওয়ার মতো সাহসী ও নজিরবিহীন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে মাদ্রিদ। সম্প্রতি স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেড্রো সানচেজ ইউরোপীয় ইউনিয়নকে ইসরাইলের সাথে সমস্ত বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা চুক্তি স্থগিত করার প্রকাশ্য আহ্বান জানান এবং ফিলিস্তিনের জন্য জরুরি উন্নয়ন তহবিল বাড়ানোরও ঘোষণা দেন।
অন্যদিকে, ফাইনালে আর্জেন্টিনার পরাজয় ফিলিস্তিনিদের জন্য একধরনের অতিরিক্ত স্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কারণ আর্জেন্টিনার বর্তমান প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রকাশ্যেই ইসরাইলের প্রতি নিঃশর্ত ও অন্ধ সমর্থন জ্ঞাপন করে আসছেন, যদিও লাতিন আমেরিকার দেশটির সাধারণ জনগণের একটি বিশাল অংশ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায়সংগত অধিকারের প্রতি সবসময় সহানুভূতিশীল। ফিলিস্তিনি বিশিষ্ট সাংবাদিক আলা রিমাউই উল্লেখ করেছেন যে, ইসরাইলি গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী কর্মকর্তারা রাজনৈতিক বৈরিতার কারণেই মূলত স্পেনের পরাজয় কামনা করেছিল এবং এক কট্টর ইসরাইলি রাব্বি স্পেনের হারের জন্য বিশেষ প্রার্থনাও করেছিলেন। সমস্ত বৈরিতা, রাজনৈতিক জটিলতা ও যুদ্ধকালীন চরম কষ্টের মাঝে স্পেনের এই বিশ্বজয় ফিলিস্তিনিদের মনে এক টুকরো নির্মল আনন্দ এবং বিশ্বমঞ্চে তাদের পাশে বিশ্বস্ত বন্ধুদের উপস্থিতি নিশ্চিত করার এক অনন্য উপলক্ষ এনে দিয়েছে।
মন্তব্য করুন