আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনের বিশালমঞ্চে বাংলাদেশের ইতিহাস হয়তো খুব দীর্ঘ নয়, আর পদকের পরিসংখ্যানের খাতাটি বেশ ছোট। তবে কিছু অর্জনের ওজন সংখ্যা দিয়ে মাপা যায় না। কমনওয়েলথ গেমসের সুদীর্ঘ যাত্রায় বাংলাদেশের ঝুলিতে জমা হয়েছে মাত্র ছয়টি পদক, যার মধ্যে রয়েছে দুটি স্বর্ণ এবং চারটি রৌপ্য। আর এই পুরো গৌরবের ইতিহাসটি এক সুতোয় গাঁথা রয়েছে কেবল একটিমাত্র ডিসিপ্লিনের সঙ্গে সেটি হলো শুটিং।
স্বাধীন বাংলাদেশের কমনওয়েলথ গেমসে পথচলা শুরু হয়েছিল ১৯৭৮ সালে কানাডার এডমন্টনে। তখন আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে দেশটি ছিল একদম নতুন এবং সীমিত সামর্থ্যের অধিকারী। প্রথম আসরে কোনো পদক না মিললেও শুরু হয়েছিল লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে অংশগ্রহণের এক সাহসী লড়াই। এরপর দীর্ঘ অপেক্ষা শেষে আসে সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ১৯৯০ সালে নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ডে শুটিং রেঞ্জে ১০ মিটার এয়ার পিস্তল পেয়ার্সে আতিকুর রহমান ও আবদুস সাত্তার নিনি দেশের জন্য প্রথম পদক ছিনিয়ে আনেন, যা ছিল সরাসরি স্বর্ণপদক। অকল্যান্ডের আকাশে সেদিন বেজে উঠেছিল ‘আমার সোনার বাংলা’, আর দুই শুটার প্রমাণ করেছিলেন বিশ্বের সেরাদের হারিয়েও উঁচুতে দাঁড়াতে পারে বাংলাদেশ।
সেই প্রথম স্বর্ণ জয়ের পর কমনওয়েলথে বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য আস্থার জায়গায় পরিণত হয় শুটিং। ১৯৯৮ সালে কুয়ালালামপুরে ৫০ মিটার ফ্রি পিস্তলে রুপা জিতে আবার মঞ্চে ফেরেন অভিজ্ঞ আতিকুর রহমান। এরপর ২০০২ সালের ম্যানচেস্টার গেমসে জন্ম নেয় আরেকটি রূপকথা। মাত্র ১৫ বছর বয়সের কিশোর আসিফ হোসেন খান ১০ মিটার এয়ার রাইফেলের ফাইনালে বিশ্বসেরাদের পেছনে ফেলে দেশের জন্য এনে দেন দ্বিতীয় স্বর্ণপদক। তার এই জয় দেশের ক্রীড়াঙ্গনে নতুন এক স্বপ্নের বীজ বুনে দিয়েছিল।
সময়ের পালাবদলে তরুণের হাতে ব্যাটন তুলে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১০ সালের দিল্লি গেমসে। ১০ মিটার এয়ার রাইফেল পেয়ার্সে রুপা জিতে দেশের নাম উজ্জ্বল করেন আবদুল্লাহ হেল বাকি ও অভিজ্ঞ আসিফ হোসেন খান। এরপর ২০১৪ সালের গ্লাসগো এবং ২০১৮ সালের গোল্ড কোস্ট কমনওয়েলথ গেমসে ১০ মিটার এয়ার রাইফেলে টানা দুটি ব্যক্তিগত রুপা জিতে নিজেকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান আবদুল্লাহ হেল বাকি। স্বর্ণের খুব কাছে গিয়েও রৌপ্য পদকে সন্তুষ্ট থাকা এই শুটার বাংলাদেশের কমনওয়েলথ ইতিহাসে হয়ে ওঠেন আস্থার এক অবিচল প্রতীক।
বাংলাদেশের এই ছয়টি পদকের গল্পের পেছনে রয়েছে তীব্র সীমাবদ্ধতা, প্রতিকূলতা এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তি। উন্নত অবকাঠামো কিংবা বিশ্বমানের প্রস্তুতির সুযোগ না থাকলেও দেশের অ্যাথলেটরা নিজেদের সেরাটুকু নিঙড়ে দিয়েছেন। তবে বার্মিংহামের পর আসন্ন গ্লাসগো ২০২৬ গেমসেও শুটিং ডিসিপ্লিন বাদ পড়ায় পদকের সবচেয়ে বড় দরজাটি বন্ধ রয়েছে। তবুও দেশের ক্রীড়াপ্রেমীদের আশা, শুটিংয়ের বাইরে অন্য কোনো ডিসিপ্লিনের অ্যাথলেট হয়তো একদিন নতুন কোনো ইতিহাস লিখবেন এবং গ্লাসগোর আকাশে আবারও সগর্বে উড়বে লাল-সবুজ পতাকা।
মন্তব্য করুন