পলাতক সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের গুলশানের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে দ্বিতীয় দিনের মতো অভিযান ও মালামালের তালিকা প্রস্তুতের কাজ শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি বিশেষ টিম। সোমবার (২০ জুলাই) দুদকের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আকতারুল ইসলাম গণমাধ্যমের কাছে এই অভিযানের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
দুদক সূত্রে জানা গেছে, কমিশনের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে গঠিত উচ্চপর্যায়ের একটি টিম এই অভিযানের সার্বিক নেতৃত্ব দিচ্ছে। আদালতের সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা মেনে আজকেও ফ্ল্যাটের ভেতরে থাকা বিভিন্ন আসবাবপত্র ও মূল্যবান সম্পত্তির ইনভেন্টরি বা পরিমাপের কাজ চলছে। এর আগে গত রোববার সাবেক ভূমিমন্ত্রীর এই ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে তল্লাশি চালানো হয় এবং সেখানে বিপুল পরিমাণ দামি সম্পদের সন্ধান পাওয়া যায়। আজকের এই দিনের অভিযান পুরোপুরি শেষ হওয়ার পর জব্দকৃত মালামালের বিস্তারিত বিবরণ আনুষ্ঠানিকভাবে গণমাধ্যমকে জানানো হবে বলে জানিয়েছে দুদক।
উল্লেখ্য, গতকালের প্রথম দিনের অভিযানে ওই ফ্ল্যাট থেকে বিলাসবহুল ৩শটির বেশি কোট, ৫৩২টির বেশি টাই, বিশ্বখ্যাত রোলেক্স ব্র্যান্ডের ৪টিসহ মোট ৮টি ঘড়ির বক্স, ৩ সেট মুক্তার (পার্ল) গয়না, ৪টি আকর্ষণীয় ঝাড়বাতি, একটি করে খাট ও সোফা এবং প্রায় ১শটি কামিজ উদ্ধার করা হয়। বাসা থেকে জব্দ করা রোলেক্স ঘড়িগুলোর ক্রয়ের মূল্যের রসিদ খতিয়ে দেখা গেছে, প্রতিটি ঘড়ির বাজারমূল্য আনুমানিক ১৪ হাজার থেকে ১৭ হাজার ৫০০ মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
দেশে ক্ষমতার বড় ধরনের পটপরিবর্তনের পর থেকেই সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করে দুদক। অনুসন্ধানের একেবারে শুরুর দিকে দুদক, সিআইডি ও এনবিআরের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে একটি ৭ সদস্যের বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছিল। পরবর্তীতে মামলা ও তদন্তের কাজের সুবিধার্থে এবং টিম লিডারের পদোন্নতি বা বদলিজনিত কারণে টাস্কফোর্সের টিমটি পুনর্গঠন করা হয়। সর্বশেষ গত বছরের (২০২৫ সাল) ৯ সেপ্টেম্বর থেকে দুদকের উপ-পরিচালক মো. মশিউর রহমানের নেতৃত্বে ৯ সদস্যের এই বিশেষ টিম তার বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান ও তদন্তের কাজ অত্যন্ত কঠোরভাবে পরিচালনা করে আসছে। তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও নানা অনিয়মের অভিযোগে এরই মধ্যে একাধিক দুর্নীতির মামলা দায়ের করেছে দুদক। এসব মামলার চার্জশিটে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী ছাড়াও তার স্ত্রী এবং ইউসিবি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান রুকমীলা জামানকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের একাধিক কর্মচারী এবং ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের অর্ধশতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীকেও এসব মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এর আগে গত ২ জুলাই আদালতের এক বিশেষ আদেশে সাইফুজ্জামান চৌধুরীর গুলশানের দুটি ফ্ল্যাটের সঠিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যবস্থাপনা, তদারকি এবং যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের সম্পূর্ণ দায়িত্ব নিজেদের জিম্মায় নেয় দুদক। আদালতের দেওয়া চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, সাবেক ভূমিমন্ত্রী এবং তার বিভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নামে থাকা ঢাকার গুলশান-৬৬ নম্বর রোডের নর্থওয়েস্ট (বি) ব্লকের ১১ নম্বর প্লটের ‘এ-৭’ (আয়তন ৩৭৪৭ বর্গফুট) এবং ‘বি-৭’ (আয়তন ৩৮৩২ বর্গফুট) নম্বরের দুটি ফ্ল্যাটের সঠিক দেখভালের জন্য দুদকের সম্পদ ব্যবস্থাপনা ইউনিটের পরিচালককে রিসিভার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, আদালতের চিঠির নির্দেশ অনুযায়ী ফ্ল্যাটে রিসিভারের প্রবেশ এবং মালামালের ইনভেন্টরি তৈরির সময় আইনানুগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গুলশান রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. নিলয় রহমানকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, এর আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি আদালত সাইফুজ্জামান চৌধুরীর যুক্তরাজ্যে থাকা ৫১৮টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট ক্রোক করার কঠোর নির্দেশ দেন। এছাড়া গত ১৩ জানুয়ারি তার সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিশ্বের আটটি ভিন্ন দেশে থাকা বাড়ি, ফ্ল্যাট ও অ্যাপার্টমেন্ট জব্দের আদেশও দেন আদালত। একই সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে তার নামে পরিচালিত দুটি বাণিজ্যিক কোম্পানিতে করা বড় অঙ্কের বিনিয়োগ অবরুদ্ধ বা ফ্রিজ করারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আদালতের নথিপত্র অনুযায়ী, দেশের বাইরে সাইফুজ্জামানের এসব অবৈধ সম্পদ ও বিভিন্ন খাতে করা বৈদেশিক বিনিয়োগের মোট আর্থিক পরিমাণ প্রায় ২ হাজার ৩২০ কোটি ৯২ লাখ টাকা। অভিযুক্ত সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদ ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ভূমি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরবর্তীতে ২০১৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত একই গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
মন্তব্য করুন