গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীন যাচ্ছেন. আগামী ২১ জুন থেকে শুরু হতে যাওয়া এই সফরটিকে কেন্দ্র করে ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে জোর প্রস্তুতি চলছে. রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক অঙ্গনে এই সফরটি বিশেষভাবে নজর কেড়েছে, কারণ প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রথম বিদেশ সফরের প্রথাগত তালিকায় থাকা ভারত ও চীনকে সরাসরি এড়িয়ে প্রথমে একটি তৃতীয় দেশ হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছেন. সফরসূচি অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়া সফর করবেন এবং এরপর ২৩ জুন কুয়ালালামপুর থেকেই বেইজিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে ২৬ জুন পর্যন্ত চীন সফর করবেন. বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-চীন বিতর্ক এড়ানো, আঞ্চলিক কূটনীতিতে ভারসাম্যের বার্তা দেওয়া এবং দেশের অভ্যন্তরীণ জনমতের কৌশলগত দিক বিবেচনা করেই প্রথম গন্তব্য হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নেওয়া হয়েছে. এই সফরের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার বন্ধ থাকা শ্রমবাজার পুনরায় চালু এবং বাংলাদেশে চীনের বড় বড় প্রকল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও বেগবান করার এক বিশাল সুযোগ তৈরি হতে যাচ্ছে.
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সবচেয়ে বেশি জোর দেওয়া হবে বন্ধ থাকা শ্রমবাজারের ওপর. সিন্ডিকেটসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ রয়েছে. এই সফরে যেসব বাংলাদেশি শ্রমিকের বৈধ কাগজপত্র নেই তাদের বৈধতা দেওয়া এবং নতুন করে শ্রমবাজারটি উন্মুক্ত করার বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনার বড় সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করছে সরকার. এছাড়া শিক্ষাখাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে, যার মাধ্যমে আরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী দেশটিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন.
২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর বেইজিং সফরে বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রায় ১৫টির মতো সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার প্রবল আভাস রয়েছে. এই সফরে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কিছু মেগা প্রকল্পের বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে:
অবকাঠামো ও সেতু প্রকল্প: বাংলাদেশে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় পদ্মা সেতু, যমুনায় আরেকটি নতুন সেতু নির্মাণ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়ে চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে.
অর্থনৈতিক অঞ্চল ও বিনিয়োগ: সম্প্রতি একনেকে অনুমোদিত চীনের ঋণে ৪ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রকল্পের অগ্রগতি এবং বেইজিংয়ে একটি বিনিয়োগ সম্মেলন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে.
আর্থিক ও বাণিজ্য চুক্তি: দুই দেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (FTA), মুদ্রা বিনিময় চুক্তি, বাংলাদেশে একটি চীনা ব্যাংক স্থাপন এবং চীনা মুদ্রায় একটি বন্ড চালুর প্রস্তাব খতিয়ে দেখা হচ্ছে.
প্রযুক্তি ও কৃষি হস্তান্তর: বৈদ্যুতিক গাড়ি (EV) নির্মাণে চীনের বিনিয়োগ ও কারিগরি প্রযুক্তি সহায়তা চাওয়ার পাশাপাশি আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি হস্তান্তরের প্রস্তাব দেবে বাংলাদেশ.
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারত ও চীন দুই দেশই অত্যন্ত প্রভাবশালী. তবে ২০২৪ সালে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে চীন দ্রুতই বাংলাদেশের নতুন সরকার ও আওয়ামী লীগ বিরোধী দলগুলোর সাথে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করে. অন্যদিকে ভারতের সাথে সম্পর্ক কিছুটা স্তিমিত হলেও নির্বাচনের আগে থেকেই তারা নতুন সরকারের সাথে কাজ করার আগ্রহ দেখায় এবং বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ভারত সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণও জানানো হয়েছিল. একই সাথে চীনের রাষ্ট্রদূত এবং মে মাসে চীনের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকেও বেইজিং সফরের আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়.
কিন্তু দুই পরাশক্তি ভারত ও চীনের মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং বিতর্ক এড়াতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকা মালয়েশিয়াকে তাঁর প্রথম গন্তব্য হিসেবে বেছে নেন. আঞ্চলিক রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, মালয়েশিয়ার সাথে চীন ও পশ্চিমাবিশ্ব উভয়েরই ভালো সম্পর্ক রয়েছে. ফলে কুয়ালালামপুরকে প্রথম সফরের তালিকায় রেখে প্রধানমন্ত্রী মূলত ভারত ও চীনের মধ্যে একটি চমৎকার কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার কৌশলগত বার্তা দিয়েছেন.
মন্তব্য করুন