আমাদের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় বড় ধরনের একটি ঘাটতি হলো 'আর্থিক সাক্ষরতা' বা টাকা ব্যবস্থাপনার বাস্তব শিক্ষার অভাব, যা মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের সঙ্গে সবচেয়ে নিবিড়ভাবে জড়িত। স্কুলের বহু বছরের পথচলায় শিক্ষার্থীরা ত্রিভুজের ক্ষেত্রফল, উদ্ভিদের সালোকসংশ্লেষণ কিংবা নদীর নাম মুখস্থ করলেও ব্যাংক হিসাব পরিচালনা, বাজেট তৈরি, ঋণ, সুদের প্রকৃত হিসাব ও বিনিয়োগের ঝুঁকি সম্পর্কে অজ্ঞ থেকে যাচ্ছে। প্রাতিষ্ঠানিক এই আর্থিক অজ্ঞতার কারণে রহিম সাহেবের মতো সাধারণ চাকরিজীবীরা মাসের শুরুতে বেতন পেয়েও হিসাবের ফাঁকে পড়ে মাঝমাসে শূন্য পকেটে দিন কাটান এবং সামান্য জরুরি পরিস্থিতিতেও ঋণের জালে জড়িয়ে পড়েন। এই একই কারণে শহরের তরুণরা ক্রেডিট কার্ডের অনিয়ন্ত্রিত খরচে জর্জরিত হচ্ছে, গ্রামীণ কৃষকরা মহাজনদের চক্রবৃদ্ধি সুদের ফাঁদে আসল-সুদ হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে, আর মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সহজ কিস্তির আড়ালে প্রকৃত খরচের অংক না বুঝেই ঋণের বোঝা বাড়াচ্ছে।
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য জটিল কোনো অর্থনৈতিক তত্ত্ব নয়, বরং স্কুলের পাঠ্যবইয়ে বাজেট তৈরি, সঞ্চয় ও বিনিয়োগের পার্থক্য, ব্যাংক হিসাব খোলার নিয়ম এবং প্রতারণামূলক আর্থিক ফাঁদ চেনার মতো সহজ ও ব্যবহারিক পাঠ যুক্ত করা জরুরি। পৃথিবীর অনেক দেশ, যেমন ইংল্যান্ডে, মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই নাগরিক ও গণিত শিক্ষার অংশ হিসেবে এই বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পরিবর্তনের এই হাওয়া শুধু পাঠ্যবইয়ে সীমাবদ্ধ না রেখে পরিবারেও মা-বাবাদের উচিত সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই দামের তুলনা করা এবং উপহারের টাকা জমিয়ে রাখার মতো স্বাস্থ্যকর চর্চা শেখানো। টাকার হিসাব শেখার অর্থ কৃপণ হওয়া নয়, বরং নিজের জীবনকে আত্মনির্ভরশীল ও নিরাপদ রাখার ক্ষমতা অর্জন করা; কারণ জীবন শুধু পরীক্ষার খাতা দিয়ে চলে না, চলে প্রতিদিনের সঠিক অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত দিয়ে।
মন্তব্য করুন