
এক হাজার কোটি টাকার বেশি পুঞ্জীভূত লোকসানের বড় ধাক্কা নিয়ে আগামী ১৩ নভেম্বর থেকে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের আখ মাড়াই মৌসুমে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী রাজশাহী চিনিকল। কয়েক দশক ধরে ক্রমাগত লোকসানে ধুঁকতে থাকা এই সুগার মিলটি এখন এক প্রকার রুগ্ণ শিল্পে পরিণত হয়েছে। আখের তীব্র সংকট, সময়মতো চিনি বিক্রি না হওয়া এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে প্রতি বছরই নির্ধারিত সময়সীমার আগেই মাড়াই কাজ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছে মিল কর্তৃপক্ষ।
মাড়াই মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ও মূল্যবৃদ্ধি: রাজশাহী চিনিকল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চলতি মৌসুমে আখের উৎপাদন বাড়াতে প্রতি মণ আখের দাম ১১ টাকা বাড়িয়ে ২৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ১৩ নভেম্বর থেকে শুরু হয়ে আগামী বছরের ১৩ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ৬০ দিন আখ মাড়াইয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। এই সময়ে প্রায় ৭০ হাজার টন আখ মাড়াই করে ৩ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চিনিকলে নিবন্ধিত প্রায় ৩ হাজার ৯০০ জন চাষি সরাসরি আখ সরবরাহ করবেন।
তবে আগের বছরগুলোর মতো এবারও যদি পর্যাপ্ত আখ না পাওয়া যায়, তবে সময়ের আগেই উৎপাদন বন্ধ করতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বিশাল ব্যবধান: চলতি মৌসুমে কারখানাটিতে এক কেজি চিনি উৎপাদনে প্রাক্কলিত খরচ ধরা হয়েছে প্রায় ৩০০ টাকা। অথচ সরকারি নির্দেশনা মেনে বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সেই চিনি প্রতি কেজি বিক্রি করতে হচ্ছে মাত্র ১২৫ টাকা করে। ফলে প্রতি কেজি চিনিতেই চিনিকলটির উৎপাদন খরচের অর্ধেকেরও বেশি অর্থ লোকসান গুণতে হচ্ছে।
পুঞ্জীভূত লোকসান ও দায়ভার: উৎপাদন বিভাগের তথ্যানুযায়ী, বিগত ২০২৫-২৬ মাড়াই মৌসুমে চিনিকলটি প্রায় ৭০ কোটি টাকা এবং ২০২৪-২৫ মৌসুমে প্রায় ৬৯ কোটি টাকা লোকসান গুনেছে। সব মিলিয়ে গত মাড়াই মৌসুম পর্যন্ত রাজশাহী চিনিকলের মোট পুঞ্জীভূত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৬৪ কোটি টাকা। তবে চিনিকলের মহাব্যবস্থাপক (অর্থ) মো. সাদ্দাম হোসেন জানান, এই বিশাল অঙ্কের অর্থকে কেবল লোকসান না বলে স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ ও মানবসম্পদের নিরিখে ‘মোট দায়’ হিসেবে বিচার করা উচিত, এতে নীট লোকসানের অঙ্ক কিছুটা কম দাঁড়াবে।
কৃষকদের অনীহা ও বিকল্প চাষাবাদ: রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্যমতে, এলাকায় দিন দিন আখের আবাদ আশঙ্কাজনক হারে কমছে। ২০১৬-১৭ মৌসুমেও রাজশাহীতে ৪০ হাজার ৮৬৭ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হলেও ২০২৫-২৬ মৌসুমে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৯ হাজার ৩৪০ হেক্টরে। চিনিকলে আখ বিক্রি করে সময়মতো টাকা না পাওয়া ও নানা ভোগান্তির কারণে কৃষকরা এখন মাড়াই মেশিনে গুড় তৈরি অথবা বিকল্প লাভজনক ফসল ও শাকসবজি চাষে ঝুঁকছেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: রাজশাহীর হরিয়ানে ১৯৬২ সালে শুরু হয়ে ১৯৬৫ সালে চালুর পর ১৯৭২ সালে জাতীয়করণ করা হয় এই রাজশাহী সুগার মিলটি। ২০ হাজার টন বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতার মিলটি আশির দশকের শেষভাগ পর্যন্ত লাভজনক থাকলেও পরবর্তীতে লোকসানী প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়। বর্তমানে মিলটিতে প্রায় ১ হাজার ৫ জন কর্মকর্তা, কর্মচারী ও শ্রমিক কর্মরত আছেন, যাঁদের সারা বছরের বেতন-ভাতা মেটাতে গিয়েই পরিচালন ব্যয়ের এক বিশাল অংশ লোকসান হিসেবে যোগ হচ্ছে।