
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ও আচার-আচরণ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। নির্বাচনে কেন্দ্র দখল ও কারচুপির জোরালো অভিযোগ তুলে কেন্দ্রীয়ভাবে দলটির পক্ষ থেকে কড়া প্রতিবাদ জানানো হলেও, স্থানীয় পর্যায়ে পরাজিত প্রার্থী বিজয়ী বিএনপি প্রার্থীকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেওয়া এবং মিষ্টিমুখ করানোর মতো ঘটনা ঘটিয়েছে। জামায়াতের এই ‘দ্বিমুখী’ ও স্ববিরোধী ভূমিকার বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনা প্রকাশ করেছে তাদেরই রাজনৈতিক জোটসঙ্গী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)।
নির্বাচনের প্রেক্ষাপট ও ফলাফল: গত বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ (সদর, রুহিয়া ও ভুল্লী) আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ২ লাখ ২৭ হাজার ৯১৭ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন পান ৯৬ হাজার ৫১৩ ভোট। এর আগে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে বিএনপির তৎকালীন মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জয়ী হলেও তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ায় আসনটি শূন্য হয়। উপনির্বাচনে জয়ী মির্জা ফয়সল আমীন হলেন রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই।
জামায়াতের দ্বিমুখী অবস্থান: ভোটের দিন থেকেই ব্যালটে সিল মারা, জাল ভোট ও এজেন্টদের বের করে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করে জামায়াত। শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) রাজধানীর মগবাজারে এক সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও ইসি সচিবের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, তাঁরা অনিয়মকারীদের সঙ্গে আঁতাত করেছেন।
তবে এর ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যায় ঠাকুরগাঁওয়ে। ফলাফল ঘোষণার পর দিন শুক্রবার দুপুরে বিজয়ী প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন ফুলের তোড়া নিয়ে জামায়াতের পরাজিত প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের বাসভবনে যান। এ সময় দুই প্রার্থী কোলাকুলি করেন এবং পরস্পরকে মিষ্টিমুখ করিয়ে এলাকার উন্নয়নে একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দেন।
এনসিপি নেতাদের সরব প্রতিক্রিয়া: জামায়াতের এই অবস্থান পরিবর্তনের তীব্র সমালোচনা করে এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া শাহবাগের এক সমাবেশে বলেন, “সকালে আমরা দেখি ভোট কারচুপি হয়েছে, আর বিকেলে সরকারি ও বিরোধী প্রার্থী একে অপরকে মিষ্টি খাওয়াচ্ছেন। এ ধরনের ভূমিকা আমাদের রাজনীতিকে সংকটময় করে তুলেছে। বাংলাদেশ ও গণতন্ত্রের সুশাসনের জন্য এনসিপি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।”
একই সুরে কুষ্টিয়া বা যশোর এলাকার পথসভায় এনসিপির সংসদ সদস্য ও জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “আমরা ঢাকায় বলব ভোটে কারচুপি হয়েছে, আবার স্থানীয়ভাবে গিয়ে ফলাফল মেনে নিয়ে মিষ্টি খাওয়াব—এ ধরনের বিরোধী দলের ভূমিকা চলতে পারে না। বিরোধী দলকে বিকল্প সরকার হিসেবে শক্তিশালী ও স্পষ্ট অবস্থান নিতে হবে।”
জোটের অভ্যন্তরীণ দূরত্ব: বিশ্লেষকদের মতে, ১১ দলীয় ঐক্যের অংশ হলেও আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এনসিপি এখন নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও জনসম্পৃক্ততা বাড়াতে জামায়াত থেকে কিছুটা সাংগঠনিক দূরত্ব বজায় রাখার কৌশল নিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় জামায়াত-ঘনিষ্ঠ খুলনা বিভাগীয় লংমার্চে এনসিপির শীর্ষ আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের অনুপস্থিতি এবং এই উপনির্বাচন নিয়ে কঠোর অবস্থান দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।