
প্রতিদিনই দেশের কোনো না কোনো সড়কে ঝরে পড়ছে তাজা প্রাণ, দীর্ঘ হচ্ছে অকালমৃত্যুর দীর্ঘ মিছিল। সাম্প্রতিক সময়ে সড়ক দুর্ঘটনার ভয়াবহ চিত্র যেন আমাদের নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে তরুণ বিচারক একেএম সামিউল হকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশকে নাড়া দিয়েছে। ট্রাকের রড গ্লাস ভেদ করে শরীরে ঢুকে যেভাবে একজন সম্ভাবনাময় তরুণ বিচারকের জীবনপ্রদীপ নিভে গেল, তা কেবল একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা নয় বরং আমাদের দেশের ভঙ্গুর সড়ক ব্যবস্থাপনা, তদারকির অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক অদূরদর্শিতার একটি নির্মম চিত্র।
এই ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনাগুলো ঘটার পেছনে বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট কারণ রয়েছে। প্রথমত, যানবাহনের অতিরিক্ত গতি এবং চালকদের দীর্ঘ সময় ধরে একটানা গাড়ি চালানোর ফলে তৈরি হওয়া ক্লান্তি বা ঝিমুনি দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। গভীর রাতে বা ভোরের দিকে রডবোঝাই ট্রাক কোনো ধরনের পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক বাতি বা সিগন্যাল ছাড়াই সড়কে থামিয়ে রাখা এবং গাড়িগুলোতে আধুনিক ফিটনেসের চরম ঘাটতি এই ধরনের প্রাণঘাতী সংঘাত ডেকে আনে। দ্বিতীয়ত, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ডিজাইন, হঠাৎ বাঁক থাকা, সড়কের পাশে অপ্রয়োজনীয় গাছের ডালপালা বা আলোঝলমলে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড চালকদের মনোযোগে বিঘ্ন ঘটায়, যা দুর্ঘটনা এড়ানোর সুযোগ কমিয়ে দেয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, সড়ক দুর্ঘটনা বর্তমানে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য ও অর্থনীতির জন্য একটি বিরাট সংকট। দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে সড়কে মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি। উন্নত দেশগুলোতে ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ বা নিরাপদ পদ্ধতির মাধ্যমে গতি নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, মানসম্মত যানবাহন এবং সচেতন ব্যবহারকারী নিশ্চিত করা হলেও আমাদের দেশে এই নিয়মগুলোর যথাযথ বাস্তবায়ন দেখা যায় না।
আমাদের দেশে সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত নয়, বরং এটি বহুপ্রতিষ্ঠানের কাজের পরিধির সাথে জড়িত। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নীতি প্রণয়ন করলেও, বিআরটিএ কেবল যানবাহন নিবন্ধন ও ফিটনেস প্রদানে সীমিত থাকে। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, এলজিইডি, সিটি কর্পোরেশন, ট্রাফিক পুলিশ এবং হাইওয়ে পুলিশ আলাদাভাবে কাজ করে চলেছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, সরকারি এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয়ের চরম অভাব রয়েছে এবং কেউই নিজেদের কর্তৃত্ব ছাড়তে বা অন্যকে মানতে নারাজ।
সড়কে এই অকালমৃত্যুর মিছিল থামাতে হলে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করলে চলবে না। সড়ক নির্মাণ থেকে শুরু করে যানবাহন ও চালকদের লাইসেন্স প্রদান, ফিটনেস যাচাই, গতি নিয়ন্ত্রণ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে শক্তিশালী আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান যদি সম্মিলিতভাবে আধুনিক ‘সেফ সিস্টেম অ্যাপ্রোচ’ অনুসরণ করে এবং কঠোরভাবে আইন বাস্তবায়ন করে, তবেই কেবল দেশের সড়কগুলোকে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ করে তোলা সম্ভব হবে।