
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন বেতন কাঠামো বা ‘পে স্কেল’ ঘোষণার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। সরকারের এই উদ্যোগটি সাড়ে ১৪ লাখের বেশি সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য আশার আলো দেখালেও, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এটি সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, নতুন পে স্কেল মুদ্রাস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে, যা বাজারের নিত্যপণ্যের দাম বাড়িয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও অসহনীয় করে তুলতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশ উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে সার্বিক মূল্যস্ফীতির হার নয় শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান মনে করেন, বেতন বৃদ্ধির জন্য সরকারকে বড় অঙ্কের অর্থ যোগান দিতে হবে, যার জন্য নতুন করে টাকা ছাপানো বা ঋণ নেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। বাজারে অতিরিক্ত অর্থের প্রবাহ এবং সরকারি চাকরিজীবীদের বর্ধিত ক্রয়ক্ষমতা পণ্যের চাহিদাও বাড়িয়ে দেবে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ ঠিক না থাকলে ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কৃত্রিম সংকট তৈরি করে পণ্যের দাম বাড়িয়ে দেয়, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে বেসরকারি খাতের সীমিত আয়ের মানুষের ওপর।
বেতন বৈষম্যের ঝুঁকিও অর্থনীতিবিদদের ভাবিয়ে তুলছে। দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৯৫ শতাংশই বেসরকারি খাতে কর্মরত, যাদের বেতন বা আয়ের কোনো সরকারি সুরক্ষা নেই। বিস (BIISS)-এর গবেষণা পরিচালক ড. মাহফুজ কবীরের মতে, সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়লেও বেসরকারি খাতের মানুষের আয় না বাড়লে সমাজে আয় বৈষম্য ও দারিদ্র্যের হার আরও বৃদ্ধি পাবে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, দারিদ্র্যের হার ইতোমধ্যেই ২১ দশমিক চার শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা নতুন পে স্কেল বাস্তবায়নের ফলে আরও জটিল আকার ধারণ করতে পারে।
সরকার অবশ্য এই ঝুঁকিগুলো সম্পর্কে সচেতন এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ধাপে ধাপে পে স্কেল বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী পহেলা জুলাই ২০২৬ থেকে ধাপে ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করা হবে। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম দুই অর্থবছরে মূল বেতন ৫০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি করা হবে এবং তৃতীয় বছরে অন্যান্য ভাতা যুক্ত করা হবে। সরকারের দাবি, এই কৌশলী বাস্তবায়নের ফলে অর্থনীতির ওপর তাৎক্ষণিক চাপ অনেকটা কম হবে।
তবে দিনশেষে সাধারণ মানুষের স্বস্তি কেবল বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ভর করে বাজার ব্যবস্থাপনায় সরকারের সক্ষমতার ওপর। নিত্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং বেসরকারি খাতের কর্মসংস্থান ও আয় বৃদ্ধিতে সহায়ক নীতি গ্রহণ না করলে নতুন পে স্কেল সাধারণ মানুষের জন্য স্বস্তির চেয়ে দুর্ভোগই বয়ে আনতে পারে। তাই সরকারি চাকরির বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি অর্থনীতির অন্যান্য সূচককে ভারসাম্যপূর্ণ রাখার চ্যালেঞ্জটিই এখন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা।