
চলতি ২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার অগ্নিপরীক্ষায় ১০ জনের প্যারাগুয়ের কাছে ১-০ গোলে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে তুরস্ক। বিবিসি স্পোর্টসের সাংবাদিক ক্রিস ম্যাককেনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ম্যাচের মাত্র ৬৪ সেকেন্ডে মাতিয়াস গালার্জার রেকর্ড গোলে প্যারাগুয়ে এগিয়ে যাওয়ার পর পুরো ম্যাচজুড়ে ছিল তুরস্কের একচেটিয়া আধিপত্য。 প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে প্যারাগুয়ের তারকা মিগেল আলমিরন মুখ ঢেকে কথা বলার নতুন নিয়মে লাল কার্ড দেখলে প্যারাগুয়ে ১০ জনের দলে পরিণত হয়。 তবে অবিশ্বাস্য লড়াকু মানসিকতায় সেই লিড ধরে রেখে নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রেখেছে লাতিন আমেরিকার দলটি, আর টানা দুই হারে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিশ্চিত হয়েছে তুর্কিদের।
ম্যাচ শুরুর পর দর্শকরা পুরোপুরি বসার আগেই উল্লাসে মাতে প্যারাগুয়ে। খেলা শুরুর মাত্র ৬৪ সেকেন্ডের মাথায় বক্সের বাইরে থেকে এক দুর্দান্ত শটে গোল করে প্যারাগুয়েকে এগিয়ে নেন মিডফিল্ডার মাতিয়াস গালার্জা। এই গোলটি চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপের এখন পর্যন্ত দ্রুততম গোলের রেকর্ড।
এই ধাক্কা খাওয়ার পর থেকেই ম্যাচটি রূপ নেয় একমুখী লড়াইয়ে, যেখানে সমতায় ফিরতে মরিয়া হয়ে একের পর এক আক্রমণ চালাতে থাকে তুরস্ক। তবে ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে তাদের ১২টি শটের মধ্যে মাত্র একটি শট লক্ষ্যে ছিল। এর মধ্যে তুরস্কের ডিফেন্ডার মের্ত মুলদুরের একটি ডিফ্লেক্টেড হেড প্যারাগুয়ের গোলপোস্ট এবং ক্রসবার—উভয় জায়গাতেই আঘাত করে ফিরে আসে।
প্রথমার্ধের খেলা যখন শেষের পথে, ঠিক তখনই ম্যাচটিতে বড় মোড় ঘোরে。 প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে তুরস্কের ডিফেন্ডার মের্ত মুলদুরের সঙ্গে একটি বিবাদপূর্ণ পরিস্থিতিতে নিজের হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কথা বলেন সাবেক নিউক্যাসল ইউনাইটেড মিডফিল্ডার মিগেল আলমিরন।
বিশ্বকাপের আগে ফুটবলে যুক্ত হওয়া একদম নতুন একটি নিয়মের অধীনে ভিডিও অ্যাসিস্ট্যান্ট রেফারি (ভিএআর) পর্যালোচনা শেষে এল সালভাদরের রেহফারি ইভান বার্টন আলমিরনকে সরাসরি লাল কার্ড দেখান। এর ফলে বিশ্বকাপের ইতিহাসে মুখ ঢেকে কথা বলার অপরাধে লাল কার্ড দেখা প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে ইতিহাসে নাম ওঠে তাঁর। ১০ জনের দলে পরিণত হওয়া প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে তুরস্কের সুযোগ আরও বৃদ্ধি পায়।
দ্বিতীয়ার্ধেও তুরস্কের আক্রমণের ধারা অব্যাহত ছিল。 বিরতির পর মেরিহ দেমিরাল প্যারাগুয়ের গোলরক্ষক অরল্যান্ডো গিলকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেন। এরপর বদলি খেলোয়াড় দেনিজ গুল একদম কাছ থেকে হেড করার সুবর্ণ সুযোগ পেলেও তা সরাসরি গোলরক্ষকের হাতে মেরে নষ্ট করেন। ম্যাচের শেষভাগে জান উজুন দুর্দান্ত একটি শট নিলেও তা চমৎকারভাবে রুখে দেন গিল। সেই বলের ফিরতি শটে দেনিজ গুল লক্ষ্যভ্রষ্ট শট মারলে তুরস্কের শেষ আশাটুকুও শেষ হয়ে যায়, যদিও সেটি পরবর্তীতে অফসাইডের কারণে বাতিল হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার কাছে ২-০ গোলে হারার পর এই ম্যাচেও কোনো গোল করতে পারেনি তুরস্ক।
পরিসংখ্যানের দিক থেকে তুরস্ক পুরো ম্যাচে অবিশ্বাস্য রকমের আধিপত্য বিস্তার করেছিল, যা নিচে তুলে ধরা হলো:
বল দখল: অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৭১.৬ শতাংশ বল দখলে রাখার পর এই ম্যাচে ১০ জনের প্যারাগুয়ের বিপক্ষে তুরস্কের বলের দখল ছিল ৭৮.৫ শতাংশ।
শটের রেকর্ড: প্রথম ম্যাচে ৩০টি শটের পর এই ম্যাচে তারা আরও ৩২টি শট নেয়। ফুটবল পরিসংখ্যান সংস্থা ‘অপ্টা’ (Opta)-র তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের ইতিহাসে টানা দুই ম্যাচে গোল না করে সর্বোচ্চ ৬২টি শট নেওয়ার অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড গড়ল ভিনসেনজো মন্তেল্লার দল।
এক্সজি (Expected Goals - xG): দুই ম্যাচেই তুরস্কের এক্সজি (xG) প্রতিপক্ষের চেয়ে বেশি ছিল। অস্ট্রেলিয়ার ০.৭৭-এর বিপরীতে তুরস্কের ছিল ১.৩৩। আর প্যারাগুয়ের মাত্র ০.৩২ এক্সজি-র বিপরীতে তুরস্কের এক্সজি ছিল ২.১।
বক্সে স্পর্শ: দুই ম্যাচ মিলিয়ে প্রতিপক্ষের পেনাল্টি বক্সের ভেতরে ১০০টিরও বেশি বার বল স্পর্শ করার সুযোগ পায় তুর্কিরা।
১৮০ মিনিট ধরে আক্রমণাত্মক ও দৃষ্টিনন্দন ফুটবল খেলেও শুধু গোলটি করতে না পারার খেসারত দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হলো। আগামী সপ্তাহে স্বাগতিক যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে তাদের শেষ ম্যাচের ফলাফল যাই হোক না কেন, তাদের বাড়ি ফেরা এখন নিশ্চিত। অন্যদিকে, প্রথম ম্যাচে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া প্যারাগুয়ে এই জয়ে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং শেষ ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে পারলেই তাদের রাউন্ড অব থার্টি-টু (নকআউট পর্ব) নিশ্চিত হবে।