
নড়াইল জেলা শহরের এক দরিদ্র পরিবারে নেমে এসেছে চিরন্তন অন্ধকার ও মাতম। মায়ের অসচেতন মুহূর্তের চোখে নেমে আসা ঘুমের সুযোগে, খেলার ছলে বাড়ির পাশের পুকুরের পানিতে ডুবে আবু বক্কর (৫) ও ওমর ফারুক (২) নামের দুই আপন ভাই অবুঝ শিশুর করুণ মৃত্যু হয়েছে। বুধবার (১০ জুন) সকাল ১০টার দিকে নড়াইল পৌরসভার ভাটিয়া এলাকায় এই বুক ফাটানো ও হৃদয়বিদারক ঘটনাটি ঘটে। নিহত দুই শিশু ভাটিয়া গ্রামের স্থানীয় অসহায় ভ্যানচালক মাজেদুল শেখের সন্তান।
পরিবার ও স্থানীয় প্রতিবেশীদের সূত্রে জানা যায়, বুধবার সকালে ঘরের ভেতর ছোট ছেলে ওমর ফারুককে বুকের দুধ পান করাতে করাতে ক্লান্ত শরীরে একপর্যায়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন তাদের মা। মায়ের এই ঘুমের সুযোগে অবুঝ দুই ভাই আবু বক্কর ও ওমর ফারুক ঘরের দরজা গলে বাইরে উঠানে খেলতে বের হয়ে যায়। সকাল ১০টার দিকে হঠাৎ মায়ের ঘুম ভাঙলে তিনি দুই সন্তানের কাউকেই ঘরের ভেতর বা উঠানে দেখতে পাননি। মুহূর্তেই এক বুক আতঙ্ক নিয়ে তিনি আশপাশের বাড়ি ও পাড়া-মহল্লায় হন্যে হয়ে দুই সন্তানকে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন।
ভাটিয়া গ্রামের এই মর্মান্তিক ঘটনার পর উদ্ধার ও আইনি প্রক্রিয়ার বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
পুকুর থেকে উদ্ধার: কোথাও সন্তানদের হদিস না পেয়ে একপর্যায়ে মায়ের তীব্র সন্দেহ ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় বাসিন্দারা বাড়ির ঠিক পাশেই অবস্থিত একটি গভীর পুকুরে তল্লাশি শুরু করেন।
হাসপাতালে মৃত ঘোষণা: খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে সকাল সাড়ে ১০টার দিকে পুকুরের পানির তলদেশ থেকে অচেতন ও ডুবন্ত অবস্থায় বক্কর ও ফারুককে উদ্ধার করা হয়। প্রতিবেশীরা কালবিলম্ব না করে তাদের দ্রুত নড়াইল জেলা সদর হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে দুই ভাইকেই মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশের বক্তব্য: ঘটনার খবর পেয়ে নড়াইল সদর থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল ও হাসপাতাল পরিদর্শন করে। নড়াইল সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অজয় কুমার কুন্ডু গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, "ঘটনাটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং মর্মান্তিক। আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি এবং পরিবারের পক্ষ থেকে কোনো অভিযোগ না থাকায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।"
একসাথে দুই ফুটফুটে সন্তানের এমন আকস্মিক ও অকাল মৃত্যুতে ভ্যানচালক মাজেদুল শেখের পরিবারে এখন শুধুই বুক ফাটানো আর্তনাদ। সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন প্রতিবেশীরাও; পুরো ভাটিয়া এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। নড়াইল জেলা সিভিল সার্জন ও সমাজসেবকেরা এই ঘটনার পর স্থানীয় অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বিশেষ সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তারা বলছেন, বর্ষা মৌসুম ও গরমের এই সময়ে গ্রামীণ অঞ্চলের শিশুদের ক্ষেত্রে মা-বাবাকে অতিরিক্ত সতর্ক থাকতে হবে। বিশেষ করে জলাশয়, ডোবা বা পুকুর পাড় সংলগ্ন বাড়ির শিশুদের চোখের আড়াল হতে দেওয়া কোনোভাবেই নিরাপদ নয়, কারণ সামান্য একটু অসতর্কতা বা চোখের পলকের ঘুম কেড়ে নিতে পারে অমূল্য প্রাণ।