
দেশের প্রাথমিক শিক্ষার সামগ্রিক খোলনলচে বদলে ফেলে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল ও মননশীল বিকাশের লক্ষ্যে এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এখন থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রমে প্রথাগত বিষয়ের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেতে যাচ্ছে সংগীত, নাট্যকলা, নৃত্যকলা এবং চারু ও কারুকলা। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ‘শিল্প ও সংস্কৃতি’ নামের একটি নতুন পাঠ্যবই যুক্ত করা হবে। পরবর্তীতে ২০২৮ সালে নতুন কারিকুলামের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এই বিষয়গুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার মূল ধারায় স্থায়ীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
বুধবার (১০ জুন) প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক উচ্চপর্যায়ের মতবিনিময় সভায় এই সিদ্ধান্তের কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ। দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত, নৃত্যকলা, নাট্যকলা ও চারুকলা বিভাগের শীর্ষস্থানীয় শিক্ষক এবং শিক্ষাবিদদের সঙ্গে এই রূপরেখা চূড়ান্ত করতে এক ফলপ্রসূ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিমন্ত্রী জানান, শিক্ষার্থীদের শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষায় আবদ্ধ না রেখে বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা এবং ভবিষ্যৎ কর্মজীবনের জন্য প্রয়োজনীয় মনস্তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন নিশ্চিত করতেই এই শিল্প, সংস্কৃতি ও ক্রীড়াভিত্তিক শিক্ষা দর্শন চালু করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় ও সংবাদ সম্মেলন সূত্রে নতুন এই শিক্ষাক্রমের কাঠামো ও কর্মসংস্থানের যে বিশাল দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে, তার প্রধান দিকগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
'শিল্প ও সংস্কৃতি' পাঠ্যবইয়ের বিন্যাস (২০২৭): প্রাথমিক স্তর থেকেই শিক্ষার্থীদের সংস্কৃতির মূল ধারার সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে ২০২৭ সালে চালু হতে যাওয়া বইটিতে সুনির্দিষ্ট ৪টি অধ্যায় থাকবে। এগুলো হলো— চারু ও কারুকলা, সংগীত, নৃত্যকলা এবং নাট্যকলা।
বিপুল নতুন কর্মসংস্থান: প্রাথমিক শিক্ষায় এই বিশেষায়িত বিষয়গুলো চালুর ফলে দেশজুড়ে দক্ষ ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক ও প্রশিক্ষকের বিশাল চাহিদা তৈরি হবে। প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জানান, আগামী ৫ বছরের মধ্যে এই শিল্প ও সংস্কৃতি খাতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে সমন্বয়: দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চারুকলা, সংগীত বা নাট্যকলা বিভাগের গ্র্যাজুয়েটরা যাতে সরাসরি প্রাথমিকে শিক্ষক হিসেবে যুক্ত হতে পারেন, সেজন্য সরকার কাজ করছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের পাঠ্যক্রমের সাথেই 'শিক্ষকতা-সম্পর্কিত প্রস্তুতি ও বিশেষ প্রশিক্ষণ' (Pedagogy Training) সংযুক্ত করার বিষয়ে ইউজিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে আলোচনা চলছে।
শিক্ষাবিদদের মতে, প্রাথমিক স্তরে শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশের জন্য গান, নাচ ও চিত্রাঙ্কন অত্যন্ত কার্যকরী ভূমিকা পালন করে। এটি একদিকে যেমন পড়াশোনার একঘেয়েমি ও ড্রপ-আউট (স্কুল থেকে ঝরে পড়া) কমাবে, অন্যদিকে শিশুদের মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। একই সাথে সংস্কৃতি ও ক্রীড়া অঙ্গনে উচ্চশিক্ষা নেওয়া হাজার হাজার বেকার তরুণ-তরুণীর জন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে স্থায়ী ক্যারিয়ার গড়ার এক অভূতপূর্ব সুযোগ সৃষ্টি করবে সরকারের এই দূরদর্শী মহাপরিকল্পনা।