
আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস ২০২৬ উপলক্ষে ঢাকা সেনানিবাসের সেনাকুঞ্জে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, বিশ্বমঞ্চে আমাদের শান্তিরক্ষীরা যে অভূতপূর্ব কৃতিত্ব ও মর্যাদা অর্জন করেছেন, তা শত প্রতিকূলতা, সীমাবদ্ধতা এবং কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্য দিয়েই সম্ভব হয়েছে। দেশের অর্জিত এই অনন্য গৌরব যেন কোনোভাবেই ম্লান না হয়, সেটি যেকোনো মূল্যে রক্ষা করা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান ও পবিত্র কর্তব্য।
বিশ্বশান্তি রক্ষায় বাংলাদেশের অবদানের গৌরবময় পরিসংখ্যান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, এ পর্যন্ত দেশের সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর ২ লাখেরও বেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৪৩টি দেশে প্রায় ৬৩টি মিশনে সাফল্যের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানেও ৪ হাজার ২১২ জন বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী বিশ্বের ৯টি মিশনে সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করছেন এবং হাইতিতে নতুন একটি মিশনে যোগ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। বিশেষ করে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী বাহিনীতে পুরুষের পাশাপাশি বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের প্রায় ১১ শতাংশ নারী সদস্যের সাহসী অংশগ্রহণের ভূয়সী প্রশংসা করে তিনি বলেন, নারী সদস্যদের এই সক্রিয়তা শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে এক নতুন ও বৈপ্লবিক মাত্রা যোগ করেছে।
সশস্ত্র বাহিনীর গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জন্মযুদ্ধে সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিল ঐতিহাসিক এবং সেনাবাহিনীর একজন মেজরই (মেজর জিয়াউর রহমান) ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। এই গৌরবকে সশস্ত্র বাহিনীর জন্য অনন্ত প্রেরণার উৎস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বাহিনীর সর্বোচ্চ শৃঙ্খলা ও চেইন অব কমান্ডের ওপর কঠোর জোর দেন।
তিনি বলেন, "অতীতে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর স্বাধীনতার ঘোষকের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী যেভাবে ঐক্যবদ্ধভাবে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তেমনি ২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে (বিডিআর বিদ্রোহের মাধ্যমে) সশস্ত্র বাহিনীর ওপর আসা সর্বগ্রাসী আঘাতসহ সব ধরনের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বাহিনীকে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।" ইউনিফর্মধারী বাহিনীর জন্য প্রফেশনালিজম (পেশাদারিত্ব), ইউনিটি (ঐক্য), ডিসিপ্লিন (শৃঙ্খলা) এবং চেইন অব কমান্ড বজায় রাখা অপরিহার্য বলে তিনি সবাই
বর্তমান পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ এবং প্রযুক্তির দ্রুত বিবর্তনের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের এই যুগে জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশনের চ্যালেঞ্জগুলো এখন অনেক বেশি বহুমুখী ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। প্রথাগত বা আমোদের পরিচিত যুদ্ধের বাইরে এখন সাইবার যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অপব্যবহার, মিডিয়া অপপ্রচার এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট নিরাপত্তা সংকট বিশ্বশান্তির নতুন অন্তরায় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতি মোকাবিলায় জাতিসংঘ মিশনসহ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দক্ষতা প্রমাণের সুবিধার্থে সরকার সশস্ত্র ও পুলিশ বাহিনীর আধুনিকায়নে পর্যায়ক্রমিক ও যুগোপযোগী উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বিশ্বশান্তি রক্ষায় অসামান্য অবদান রাখা এবং কর্তব্যরত অবস্থায় জীবন উৎসর্গকারী বীর শান্তিরক্ষীদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে কর্মরত অবস্থায় গত ২০২৫ সালে সুদানে বর্বর হামলায় শাহাদাতবরণকারী ৬ সেনা সদস্যের স্ত্রীর হাতে বিশেষ রাষ্ট্রীয় সম্মাননা ক্রেস্ট ও উপহার তুলে দেন। একই সাথে ওই হামলাসহ সম্প্রতি চলমান বিভিন্ন মিশনে মারাত্মকভাবে আহত সশস্ত্র বাহিনীর বীর সদস্যদের হাতেও সম্মাননা তুলে দিয়ে তাদের ব্যক্তিগত খোঁজখবর নেন তিনি।
পরবর্তীতে বিভিন্ন দেশে শান্তিরক্ষা মিশনে সরাসরি কর্মরত থাকা ব্লু হেলমেটধারী সদস্যদের সঙ্গে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে কুশল বিনিময় করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আন্তর্জাতিক জাতিসংঘ শান্তিরক্ষী দিবস ২০২৬ উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত এই বিশেষ অনুষ্ঠানে সরকারের ঊর্ধ্বতন উপদেষ্টামণ্ডলী, সশস্ত্র বাহিনী ও পুলিশের শীর্ষনেতৃবৃন্দ এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীসহ বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশের বিদেশি রাষ্ট্রদূত, কূটনীতিক ও উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিদল উপস্থিত ছিলেন।