সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম বিমানবন্দরে হামলার জেরে গত ৮ দিনে ১১৮টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। এতে আটকা পড়েছেন ১৮ হাজারের বেশি প্রবাসী যাত্রী। ফাঁকা শাহজালাল বিমানবন্দর।
সৌদি আরবের রিয়াদ ও দাম্মাম আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাম্প্রতিক হামলার ঘটনার তীব্র নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দুই দেশের বিমান চলাচলে। এর ফলে বাংলাদেশেও তৈরি হয়েছে নজিরবিহীন ফ্লাইট বিপর্যয়। গত ৮ দিনে ঢাকা থেকে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যগামী মোট ১১৮টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এর ফলে ছুটিতে দেশে আসা এবং কর্মস্থলে ফেরার অপেক্ষায় থাকা ১৮ হাজারেরও বেশি প্রবাসী বাংলাদেশি যাত্রী বিমানবন্দরে আটকা পড়ে চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন।
সৌদি রুট বন্ধ থাকার এই ভয়াবহ পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়েছে দেশের প্রধান আকাশপথের কেন্দ্রস্থল হযরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরেও। একসময়ের মুখরিত ও জমজমাট বিমানবন্দরটি এখন অনেকটাই ফাঁকা ও নীরব। যাত্রীদের চিরচেনা উপচে পড়া ভিড়, স্বজনদের বিদায় জানানোর দীর্ঘ সারি কিংবা বাইরে গাড়ির জ্যাম কোনো কিছুই এখন আর দেখা যাচ্ছে না। টার্মিনালগুলো ফাঁকা থাকায় এর বিরূপ প্রভাব পড়েছে বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ দোকানপাট ও ব্যবসার ওপরেও।
বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ দিনের টানা অচলাবস্থায় ঢাকা থেকে মোট ১১৮টি ফ্লাইট বাতিল বা স্থগিত করা হয়েছে। এর মধ্যে ৫২টি সরাসরি ফ্লাইট এবং ৬৬টি ট্রানজিট বা কানেক্টিং ফ্লাইট রয়েছে।
সরাসরি বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর মধ্যে রয়েছে:
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স: ১৯টি
সৌদিয়া এয়ারলাইন্স: ১৩টি
ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স: ১০টি
অন্যদিকে রিয়াদ এয়ারওয়েজ-এর ১০টি ফ্লাইটও স্থগিত রয়েছে।
এছাড়া ট্রানজিট ফ্লাইটের তালিকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ভারতীয় পতাকাবাহী ইন্ডিগো এয়ারলাইন্স,যাদের ২৩টি ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। পাশাপাশি এমিরেটস-এর ১৪টি, কাতার এয়ারওয়েজ-এর ৯টি, সালাম এয়ার-এর ৭টি, ফ্লাইদুবাই ও এয়ার ইন্ডিয়া-র ৬টি করে এবং ইজিপ্ট এয়ার-এর ১টি ফ্লাইট বাতিল করা হয়েছে।
ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার কথা থাকলেও ফ্লাইট বন্ধ থাকায় চরম দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন প্রবাসীরা। তিন মাস বা এক বছরের ছুটিতে দেশে আসা বহু কর্মীর ভিসার মেয়াদ দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট কর্মস্থলে যোগ দিতে না পারলে অনেকেই চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। এই সংকট এড়াতে কেউ কেউ চড়া দামে বিকল্প রুটের বা অন্য বিমানবন্দরের টিকিট কেটে দেশ ছাড়ার চেষ্টা করছেন।
যেমন রিয়াদের টিকিট বাতিল হওয়ায় প্রবাসী শরিফুল ইসলাম বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার টাকা খরচ করে মদিনার টিকিট কেটেছেন। তিনি গণমাধ্যমকে জানান, সময়মতো কাজে যোগ দেওয়া জরুরি হওয়ায় বাড়তি দামের কথা আর ভাবতে পারেননি।
এদিকে এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ কাজী ওয়াহিদুল আলম বলেছেন, ‘‘রিয়াদ ও দাম্মামের মতো প্রধান রুটগুলো বন্ধ থাকলে স্বাভাবিকভাবেই সব যাত্রীর চাপ জেদ্দা ও মদিনা রুটের ওপর এসে পড়ে। এতে টিকিটের অস্বাভাবিক দাম বাড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এয়ারলাইন্সগুলোর উচিত বাতিল হওয়া টিকিটের অর্থ দ্রুত ফেরত দেওয়া অথবা তারিখ পরিবর্তনের সুযোগ সহজ করা। পাশাপাশি বেবিচককে নজরদারি বাড়াতে হবে যেন কোনো সিন্ডিকেট অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করতে না পারে।’’
সৌদি রুটের এই ভয়াবহ ফ্লাইট বিপর্যয়ের কারণে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পুরো চিত্র পাল্টে গেছে। সাধারণত আগমন ও বহির্গমন টার্মিনালে যে কোলাহল ও যাত্রীদের উপচে পড়া ভিড় থাকত, তা এখন অনুপস্থিত।
রোববার সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতরে লাগেজের ট্রলি নিয়ে যাত্রীদের ছোটাছুটি বা স্বজনদের বিদায় জানানোর চিরচেনা দৃশ্য নেই বললেই চলে। পার্কিং এলাকাও ফাঁকা। দুবাই থেকে আগত ভাইকে নিতে আসা আনিসুর রহমান জানান, তিনি জীবনে এমন ফাঁকা বিমানবন্দর দেখেননি। বহির্গমন অংশেও একই দশা। ওমরাহ যাত্রীদের কিছু উপস্থিতি থাকলেও কর্মী বা সাধারণ প্রবাসীদের ঢল দেখা যায়নি। যাত্রী না থাকায় বিমানবন্দরের বহিরাঙ্গনের দোকানপাটেও বেচাকেনায় বড় ধরনের মন্দা দেখা দিয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স জানিয়েছে, রিয়াদগামী যেসব যাত্রী টিকিট কেটেও যেতে পারছেন না, তাদের বিকল্প রুটে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। যাত্রী চাপ সামলাতে মদিনা রুটে বড় আকারের উড়োজাহাজ পরিচালনা করা হয়েছে এবং জেদ্দা রুটেও অতিরিক্ত ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তবে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত রেখেছে। রিয়াদ বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের পরবর্তী সবুজ সংকেত পাওয়ার পরই কেবল ওই রুটে ফ্লাইট চালুর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে প্রয়োজনীয় অনুমতি সাপেক্ষে আগামী ২১ অক্টোবর থেকে দাম্মাম রুটে ফ্লাইট পুনরায় চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে যাত্রীদের আপাতত জেদ্দা ও মদিনা বিমানবন্দর ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সও ২১ অক্টোবর পর্যন্ত তাদের রিয়াদগামী সব ফ্লাইট বাতিল ঘোষণা করেছে।
বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা আসতে পারে। কারণ, সৌদি আরব বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান বাজার এবং বিপুল পরিমাণ রেমিট্যান্সের উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কেবল সৌদি আরব থেকেই ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে (যা আগের অর্থবছরে ছিল ৪ দশমিক ২৬ বিলিয়ন)। আকাশপথের এই অচলাবস্থা দীর্ঘায়িত হলে একদিকে যেমন কর্মীদের কর্মসংস্থান ও যাতায়াত ব্যাহত হবে, অন্যদিকে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবাহেও এর নেতিবাচক ছায়া পড়বে।