বলিউড ‘শাহেনশাহ’ হিসেবে অমিতাভ বচ্চনের সেলুলয়েডের সাফল্যের গল্প বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের জানা। কিন্তু রূপালি পর্দার এই আলোর ঝলকানির বাইরে বিগ বি-র জীবনের এমন একটি অন্ধকার ও অম্লমধুর অধ্যায় রয়েছে, যা নিয়ে আজও রাজনৈতিক ও বিনোদন মহলে চর্চা হয়। আশির দশকে অভিনয় জগতের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সিংহাসন ছেড়ে ১৯৮৪ সালে আকস্মিকভাবেই সক্রিয় রাজনীতিতে পা রেখেছিলেন তিনি। সেই সিদ্ধান্ত তাকে ব্যালট বাক্সে বিপুল জনসমর্থন এনে দিলেও, মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই তীব্র বিতর্ক, কুৎসিত আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ এবং চরম মানসিক হতাশার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। পরবর্তীতে অমিতাভ নিজেই একাধিক প্ল্যাটফর্মে অকপটে স্বীকার করেছিলেন— রাজনীতিতে যোগ দেওয়া ছিল তার জীবনের সবচেয়ে বড় ‘ভুল সিদ্ধান্ত’।
মূলত ১৯৮২ সালে ‘কুলি’ সিনেমার শুটিংয়ের সময় এক ভয়াবহ ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার কবলে পড়েন অমিতাভ বচ্চন। মৃত্যুর মুখ থেকে তার অলৌকিক প্রত্যাবর্তন দেশজুড়ে তার জনপ্রিয়তা ও প্রভাবকে আকাশচুম্বী করে তোলে। এর ঠিক দুই বছর পর, ১৯৮৪ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আততায়ীর গুলিতে নিহত হলে ভারতের রাজনীতিতে এক বিশাল শূন্যতা ও অস্থিরতার সৃষ্টি হয়। সেই সংকটময় মুহূর্তে দেশের হাল ধরেন ইন্দিরাপুত্র রাজীব গান্ধী। রাজীব ছিলেন অমিতাভের শৈশব ও দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।
বচ্চন পরিবারের সঙ্গে নেহরু-গান্ধী পরিবারের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর ও ঐতিহাসিক। অমিতাভের পিতা কবি হরিবংশ রাই বচ্চনের সঙ্গে জওহরলাল নেহরুর এবং মা তেজি বচ্চনের সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর আত্মিক বন্ধন ছিল। সেই পুরোনো পারিবারিক দায়বদ্ধতা এবং বন্ধু রাজীব গান্ধীর বিশেষ অনুরোধেই কোনো রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ছাড়াই আবেগের বশে লোকসভা নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের এলাহাবাদ (বর্তমান প্রয়াগরাজ) কেন্দ্র থেকে কংগ্রেসের টিকিটে লড়েন অমিতাভ। বর্ষীয়ান ও ঝানু রাজনীতিক হেমবতী নন্দন বহুগুনাকে রেকর্ড ভোটে হারিয়ে সংসদে প্রবেশ করেন এই মেগাস্টার।
সংসদে প্রবেশের পর অমিতাভ বচ্চন এলাহাবাদের স্থানীয় উন্নয়ন, গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবা এবং বিনামূল্যে মেডিকেল ভ্যান চালুর মতো প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিলেও রাজনীতির ভেতরের জটিল সমীকরণ ও ক্ষমতার লড়াইয়ের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না। দলের প্রবীণরা তাকে ‘বহিরাগত চলচ্চিত্র তারকা’ হিসেবে দেখতেন। এর মধ্যেই ১৯৮৭ সালে তার রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনে নেমে আসে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়— ‘বোফর্স কেলেঙ্কারি’।
| বিতর্কের বিষয় | অমিতাভের বিরুদ্ধে অভিযোগ | আদালতের রায় ও প্রকৃত বাস্তবতা |
| বোফর্স কেলেঙ্কারি (১৯৮৭) | সুইডিশ অস্ত্র প্রস্তুতকারী সংস্থা বোফর্সের কাছ থেকে ভারত সরকারের কামান ক্রয়ের চুক্তিতে অমিতাভ ও তার ভাই অজিতাভ বচ্চন বিপুল অঙ্কের ঘুস নিয়েছেন এবং তা বিদেশি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পাচার করেছেন। | অমিতাভ প্রথম থেকেই অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং লন্ডনের আদালতে সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মানহানির মামলা ঠুকে জয়ী হন। আদালতে অভিযোগের কোনো ভিত্তি প্রমাণিত হয়নি। |
| তদন্তকারী সংস্থার ক্লিনচিট | রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে অমিতাভ বচ্চনের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি সম্পূর্ণ ক্ষুণ্ন করা হয়েছিল। | বহু বছর পর ভারতের তদন্তকারী সংস্থাগুলো তাকে সম্পূর্ণ নির্দোষ ঘোষণা করে ক্লিনচিট দেয়। এমনকি বোফর্স মামলার সুইডিশ হুইসেলব্লোয়ারও স্বীকার করেন, অমিতাভকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভুলভাবে ফাঁসানো হয়েছিল। |
রাজনীতির এই নোংরা কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডা অমিতাভ বচ্চনকে মানসিকভাবে সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছিল। বিনোদন জগতের গ্ল্যামার ও সমালোচনা সামলানোর দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থাকলেও, রাজনীতির ভেতরের নিষ্ঠুর ও বিষাক্ত আক্রমণ সামলানোর মতো চতুরতা বা দক্ষতা তার ছিল না। নিজের জীবনের এই ৩ বছরের সময়কালকে বিগ বি পরবর্তীতে ‘নরকসম অধ্যায়’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।
তীব্র অনীহা ও বিতর্কের মুখে অবশেষে ১৯৮৭ সালেই সংসদ সদস্যপদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ইস্তফা দেন অমিতাভ বচ্চন। রাজনীতি থেকে স্থায়ীভাবে ইস্তফা দিয়ে তিনি পুনরায় চিরচেনা চলচ্চিত্র জগতে ফিরে আসেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন আর কখনো ভুলেও রাজনীতির আঙিনায় পা রাখবেন না। তবে চার দশক পার হয়ে গেলেও আজও একটি আক্ষেপ বলিউড শাহেনশাহকে তাড়া করে বেড়ায়। তিনি আজও অত্যন্ত অনুশোচনার সঙ্গে স্বীকার করেন— নির্বাচনি প্রচারের সময় এলাহাবাদের সাধারণ ও সরল মানুষকে আবেগের বশে যেসব বড় বড় প্রতিশ্রুতি তিনি দিয়েছিলেন, রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে সেগুলোর অনেকটাই তিনি পূরণ করতে পারেননি। সেই অপূর্ণতার ব্যর্থতাবোধ ও আক্ষেপ আজও এই অভিনেতার মনে এক বিশাল ক্ষত হয়ে রয়ে গেছে।
মন্তব্য করুন